প্রকৃতি সেই সকাল থেকে খবরের কাগজ হাতে

নিয়ে বসে আছে। কারও সাথে কোনাে কথা বলছে

। বার বার ইয়ামিনকে নিয়ে দেয়া বিচ্ছিরি,

জঘণ্য খবরগুলাের শিরনামে চোখ বুলাচ্ছে। এমন

খবরে ওর কেমন রিয়াক্ট করা উচিত তা ও বুঝতে

পারছে না! ইয়ামিনের অন্ধকার এবং অনিশ্চিত

ভবিষ্যৎ সম্পর্কে যে ও অবগত ছিল না তেমন কিন্তু

নয়! ও প্রায়ই ইয়ামিনের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তায় মগ্ন

থাকত। শঙ্কায় থাকত ওর নিজেরও অনিশ্চিত

জীবন নিয়ে। কিন্তু তবুও সব দেখেও বুঝেও,

অদেখা অবুঝের মতাে ভান করে থাকত সর্বদা ।

কখনও ইয়ামিনকে ভালো পথে ফিরতে বলেনি।

যদি ইয়ামিন ভাবে সম্পর্কে জড়িয়ে ইয়ামিন

আটকা পড়েছে। প্রকৃতি সর্বক্ষণ চেয়েছে ওদের

দুজনার সম্পর্ক হবে মুক্ত পাখিদের মতাে। যারা

ভালােবাসে, নীর বাঁধে, কিন্তু একে অপরকে পূর্ণ

স্বাধীনতা দেয়। সম্পর্কে অতিমাত্রায় অধিকারবােধ

ধীরে ধীরে সম্পর্ককে দমবন্ধময় করে দেয়। প্রকৃতি

চায়নি ওদের সম্পর্ক আর পাঁচটা সম্পর্কের মতাে

হােক। সবসময় চাইত ওদের সম্পর্ক থােক স্বচ্ছ,

মুক্ত। আনমনে ভাবছে প্রকৃতি তবে কি সব শেষ

হয়ে যাবে শুরু হওয়ার আগেই? সত্যি ফাঁসি হবে

ইয়ামিনের? নাকি সৃষ্টিকর্তা বাঁচিয়ে দিবেন এযাত্রা!


কিছু সাদা টিউলিপ - শারমিন আক্তার সাথী


উ ৎ স র্গ

আমার সােনাবু (নানি), আর রাঙাবুকে (দাদি)। ২০২০ সালে

মাত্র পাঁচ মাসের ব্যবধানে মানুষ দুটোকে আমি হারিয়েছি।

আমার জীবনের খুব বড় একটা অংশজুড়ে দু'জনার বসবাস

ছিল। পরপারে চলে গেলেন, আমাকে দিয়ে গেলেন মাসের

পর মাসের হতাশা। আবার স্বপ্নে এসে অতি আদর করে

হতাশা কাটিয়েও দিয়ে গেলেন দুজনেই। ভালাে থাকুক

আমার সােনাবু আর রাঙাবু। তাদের এ অভিমানী বুটাকে

ছেড়ে ভালাে থাকুক পরপারে। আল্লাহ তাদের জান্নাতের

সর্বোচ্চ স্থান দান করুক। নীল আকাশে মেঘের পবিত্র ভেলায়

দুজন উড়ে বেড়াক। তাদের ভালােবাসা ও দোয়া বৃষ্টি হয়ে ঝরে

পড়ুক আমার ওপর। আর রােজ স্বপ্নে এসে বলে যাক বু ভালাে

আছি আমরা, তুই ভালাে থাক।



ভূমিকা

এ উপন্যাসের ভূমিকায় আমি কী লিখব, তা ভেবে পাই না। আর যা

ভেবেছি তা লিখতে ভয় হয় বড্ড। একটা ভিডিওতে বিশাল সাদা

টিউলিপ ফুলের বাগান দেখেই মাথায় এসেছিল এই উপন্যাসটা।

অগােছালাে জীবনের অগােছালাে কাহিনী নিয়ে লেখা কিছু কথা।

একজন ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত আসামির কিছু ভাবনা। তার প্রেমিকার

জীবনকথা, প্রকৃতি নামক খ্রিস্টান মেয়েটার সর্বগ্রাসী ভালােবাসার কিছু

কথা। সমাজে থাকা দুই-চারজন মানুষের ছােট ছােট কিছু ঘটনাকে, নাম

পুরুষে’ লেখার প্রচেষ্টা করেছি। জানি না মানুষের হৃদয়ে কতটুকু গেঁথে থাকবে

বা হৃদয় স্পর্শ করতে পারবে! তবু আমি চেষ্টা করেছি। সাধারণ মানুষ এবং

সামান্য লেখক হয়ে চেষ্টা করেছি সবার মনে একটু জায়গা করে নেওয়ার।

আমি উপন্যাসে কোনাে ধর্মকে ছােট করিনি। সব ধর্মরে প্রতি সম্মান

আমার সর্বদা ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। তাই দয়া করে কেউ

সাম্প্রদায়িতাকে টানবেন না। সর্বোপরি উপন্যাসটা সম্পূর্ণ কাল্পনিক

এবং কারও ব্যক্তিগত জীবন থেকে নেওয়া হয়নি। যা লিখেছি সবটা

আমার কল্পনারাজ্য থেকে সংগৃহীত। তবু কোনাে ব্যক্তিহৃদয়ে আঘাত

হানলে প্রথমেই আমি দুঃখিত এবং ক্ষমাপ্রার্থী।

শারমিন আক্তার সাথী

১০.১২.২০২০




ক্ষুদ্রানুভব

* সব সম্পর্কে পূর্ণতা পেতে নেই।

কিছু সম্পর্ক অপূর্ণতায় বেশ লাগে।

*সাধারণ জীবনের মাঝে অসাধারণ গল্প সবাই তৈরি করতে

পারে না। জীবনটা সাধারণ হলেও, প্রত্যেক জীবনের গল্পটা

অসাধারণ। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সাধারণ গল্প দিয়ে তৈরি হয় সাধারণ মানুষের

অসাধারণ গল্প।




যেকোনাে দিন বা মুহূর্তে ডিআইজি বা পুলিশ কমিশনার কিংবা অন্য কোনাে

উচ্চপদস্থ আইনি কর্মকর্তা ইয়ামিনকে এসে জিজ্ঞেস করবে।

-ইয়ামিন আপনার শেষ ইচ্ছা কী? শেষবার কী খেতে ইচ্ছে করছে।

আপনার? বা শেষবার কী করতে ইচ্ছে করছে?

কারণ, ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের শেষ ইচ্ছা পূরণ করার চেষ্টা করে

সব দেশের সরকার। তারপর ইয়ামিনকে শেষ গােসল করানাে হবে।

নামাজ পড়ানাে হবে। অতঃপর নিয়ে যাওয়া হবে ফাঁসির মঞ্চে। শেষনিশ্বাস

ওখানেই হয়তাে ত্যাগ করবে ইয়ামিন।

এসব কথা ভাবার সময় ইয়ামিন হুট করে ঠিক করল, যখন ওকে জিজ্ঞেস

করবে তােমার শেষ ইচ্ছা কী? তখন ও বলবে,

-আমাকে যখন ফাঁসি দেওয়া হবে তখন প্রকৃতি নামের মেয়েটাকে

আমার সামনে রাখবেন। ওর এমন ইচ্ছায় হয়তাে সবাই অবাক হবে।

হয়তাে নয়, অবশ্যই সবাই অবাক হবে। যখন পুলিশ কমিশনার বা

ডিআইজি জিজ্ঞেস করবেন, প্রকৃতি কে? তখন ইয়ামিন হাসিমুখে বলবে, যে

মেয়েটা আমাকে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ভালােবাসে। যার ভালােবাসার ছাড়া।

আমার পৃথিবী নগণ্য। জানেন, প্রকৃতির কোনাে ইচ্ছা আমি পূরণ করিনি।

ওর একটা ইচ্ছা ছিল ফাঁসিতে ঝুলে মানুষ কীভাবে মৃত্যুবরণ করে সামনে

দাড়িয়ে দেখার আর আমার হাত থেকে উপহার হিসাবে কিছু সাদা টিউলিপ

ফুল পাবার! আমি মৃত্যুর আগে প্রকৃতির একটা ইচ্ছে অন্তত পূরণ করার

চেষ্টা করব।

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের কনডেম সেলে (যেখানে ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত

আসামিদের রাখা হয়) বসে এসব হাজারও রকম ভাবনা ভাবছে ইয়ামিন।

কিছুক্ষণ আগেই ওকে কনডেম সেলে রেখে গেছেন কিছু আইনি কর্মকর্তা।

হয়তাে কদিন পর বা আজই ওর ফাসি হবে। কারণ, নির্দিষ্ট কোনাে তারিখ


জানানাে হয়নি। আইনের নিয়ম অনুসারে ফাসির তারিখ, আসামি বা তার ।

আত্মীয়স্বজনকে আগে জানতে দেওয়া হয় না।

ইয়ামিনকে যখন কনডেম সেলের দিকে নেয়া হচ্ছিল তখন বাংলা।

স্যারের বলা দুঃখু মিঞার সেই কবিতাটা মনে পড়ছিল ওর,

প্রথম যেদিন তুমি এসেছিলে ভবে,

কেঁদেছিলে তুমি হেসেছিল সবে।

এমন জীবন তুমি করিবে গঠন

মরণে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন।

লাইনগুলাে মনে পড়ায় মৃদু হাসল ইয়ামিন। সে হাসিতে ঠিক কী রহস্য

লুকিয়ে তা কেবল ও-ই জানে। অদ্ভুত এ জীবনের সব রহস্যময় হাসির

রহস্য ভেদ করা মানব মনের সাধ্য নয়। হৃদয়কাঁপানাে নিস্তব্ধ কনডেম

সেলটা দেখে ইয়ামিনের হৃৎস্পন্দন বন্ধ হবার উপক্রম হলাে। এখানে আর

কোনাে কয়েদি নেই। শুধু ও একা। কনডেম সেলের পাশেই ফাঁসির মঞ্চ।

হয়তাে কদিন পর বা আজ মধ্যরাতেই নিভে যাবে ওর জীবনের প্রদীপ।

ইয়ামিন মৃদু হেসে বলল,

—দুঃখ মিঞা গাে আমি জীবনে এমন কিছু করিনি, যার জন্য লােকজন

আমার মরণে কাঁদিবে। বরং বহু লােক স্বস্তির নিশ্বাস ফেলবে। তাদের জীবনে

যে আমি নরক বানিয়ে ফেলেছিলাম। তাচ্ছিল্য হেসে ইয়ামিন নিজেই

আবার বলল, যেখানে আমার নিজের মৃত্যুতে নিজের আফসােস হয় না,

সেখানে অন্য লােক কি দুঃখ করবে! ইয়ামিন কনডেম সেলের জমিনে শুয়ে

জোরে গান ধরল,

আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম আমরা

আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম

গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান,

গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান,

মিলিয়া বাউলা গান আর ঘাটু গান গাইতাম আমরা।

মিলিয়া বাউলা গান আর ঘাটু গান গাইতাম

আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম আমরা।

আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম,

বাইরে দাঁড়ানাে কারারক্ষীরা ইয়ামিনের গান শুনে বেশ অবাক হলাে।

যে মানুষটা জানে যে, সে যেকোনাে মুহূর্তে ফাঁসির দড়িতে ঝুলে পড়বে,

আর সে কিনা এমন উদ্ভট আচরণ করছে! কারারক্ষী ভাবছে হয়তাে ইয়ামিন

নিজের মৃত্যুভয়ে পাগলটাগল হয়ে গেছে।


পরের দিন,

ইয়ামিন কনডেম সেলের লােহার শিকের কাছে এসে কারারক্ষীকে জিজ্ঞেস

করল,

-ভাই কনডেম সেলে আমি ব্যতীত আর কেউ কি এসেছে?

কারারক্ষী গম্ভীর হয়ে জবাব দিল,

-না।

-ওহ আচ্ছা।

বরিশাল জেলে থাকাকালীন পরিচিত হওয়া দুজন কয়েদির কথা ভাবছে

ইয়ামিন। যতদূর শুনেছিল তাদেরও হয়তাে ফাসি হবে। কিন্তু কবে বা তারা

ঢাকা কোন কনডেম সেলে যাবে, তা ও জানে না। আবার এও হতে পারে।

তারা ছাড়া পেয়ে গেছে কিংবা তাদের যাবজ্জীবন কারাদন্ড হয়েছে। সবার

কপাল তাে ওর মত নয়! বরিশাল জেলে থাকাকালীন বেশ কয়েকজন

কয়েদির সাথে পরিচয় হয়েছিল ইয়ামিনের। তার কিছু কথা ভাবল ইয়ামিন,

অতীতবিলাশ

স্থান : বরিশাল।

ইয়ামিনের জন্মস্থান : বরিশাল সদর

‘বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগার

তখন বরিশালের কারাগারে ইয়ামিন বন্দী ছিল। ও যে সেলে থাকত সে

সেলেই ওর সাথে কালােমতাে একজন আসামি থাকত। ইয়ামিন যেদিন

প্রথম সেই জেলে গেল, সেদিন লােকটা ওর সাথে কোনাে কথা বলেনি।

ইয়ামিন নিজেও

রিও সাথে সেধে কথা বলার লােক নয়। চুপচাপ গম্ভীর

স্বভাবের লােক ইয়ামিন। আগেও কয়েকবার জেলে এসেছিল ও, তবে তখন জে

লেও রাজকীয় সেবা পেত। তখন ওর ক্ষমতা ছিল অন্য রকম। ক্ষমতার


দাপট বর্তমানে খুব বড়। যা এখন নেই। তাই বাকি কয়েদিদের মতো।

ওকেও সাধারণ এবং অবহেলায় রাখা হয়েছে।

গভীর রাত, রাত তখন দুইটা বাজে হয়তাে। ইয়ামিন গভীর ঘুমে

আচ্ছন্ন। কেউ বারবার ওর পেটে আঙুল দিয়ে গুতা দিচ্ছিল। ইয়ামিন চরম

বিরক্ত হয়ে চোখ মেলল। ওর কাঁচা ঘুম ভাঙলে রাগ হয় প্রচন্ড । দাঁতে দাঁত

চেপে লােকটার দিকে তাকিয়ে বলল,

-কী সমস্যা আপনার? এত রাতে বিরক্ত করছেন কেন?

লােকটা শব্দ করে হেসে জিজ্ঞেস করল,

-ঘুম ভাঙায় বিরক্ত হলেন?

তারপর খ্যাক খ্যাক করে হাসতে লাগল। গা জ্বালানাে সে হাসি।

দেখলেই রাগে সারা শরীর রাগে ঝিম ধরে যায়।

ইয়ামিন চরম বিরক্ত হয়ে বলল,

-জেলখানা আজকাল সব পাগলে ভরে গেছে। কদিন পর বরিশাল

কেন্দ্রীয় জেলখানা নাম বদলে বরিশাল কেন্দ্রীয় পাগলখানা নাম দেবে লােকে।

লােকটা নিজের হাসি বজায় রেখেই বলল,

-ভাই আপনার কী শাস্তি হবে? যাবজ্জীবন নাকি ফাঁসি? বলেই লােকটা

আবার খ্যাক খ্যাক করে হাসতে লাগল।

এমন কথায় কেউ হাসতে পারে বলে ইয়ামিনের জানা ছিল না। খানিক

রাগ হলেও বলল,

-জানি না। এখনাে চূড়ান্ত রায় দেয়নি জজ সাহেব। তার জন্য ঢাকা

সুপ্রিম কোর্টে নেবে, তারপর চূড়ান্ত রায় হবে।

লােকটা হাসি থামিয়ে বলল,

-ওহ। তবে আমি নিশ্চিত পৃথিবীর সব কোর্টেই আমার ফাঁসির সাজা

হবে।

ইয়ামিন এবার কিছুটা স্বাভাবিক হলাে। তারপর লােকটাকে জিজ্ঞেস

করল,

-কেন? এতটা নিশ্চিত কীভাবে আপনি?

লােকটা আবার বিচ্ছিরি হাসি দিয়ে বলল,

-অন্যায় যখন আমি করছি তখন আমি জানব না তাে ক্যাডা জানব?

ভাবলেশহীন হয়ে ইয়ামিন বলল,

-তাও ঠিক। আপনার ভয় করছে না?


-কেন ভয় করবে?

—আপনার ধারণামতে তাে আপনি জলদি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করবেন!

-না ভয় করে না। ফাসি হবে জেনেই তাে অন্যায় করেছিলাম। আর

অন্যায় করে নিজেই পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলাম।

-কী করেছিলেন?

-বলব তার আগে বলেন, আপনার নাম কী?

-ইয়ামিন। আপনার?

-শােনেন আমার কথা কিন্তু শুদ্ধ আঞ্চলিক মেলানাে। ছােটবেলায়

গ্রামের স্কুলে পড়েছি। মােটামুটি বড় হয়ে শহরে এসেছি। তবে কথা এখনাে

পুরােপুরি শুদ্ধ হয় না। আমার নাম মিরাজ। আমার বড় আপা আমার নাম।

রাখছিল। জন্মের পর আব্বায় নাকি আমার নাম রেখেছিলেন কালু খাঁ।

কেমন ভয়ানক নাম ভাবেন তাে। কেমন কসাই কসাই নাম। কিন্তু বড়

আপায় বদলে মিরাজ নাম দিয়েছিলেন। আমি আমার আপাকে সবচেয়ে

বেশি ভালােবাসতাম।

ইয়ামিন বুঝে গেল লােকটা একটু বেশিই বাকপুট। আর এর থেকে সহ

জে নিস্তার পাওয়াও যাবে না। তাই ছােট্ট করে তার কথার উত্তরে বলল,

-খুব ভালাে।

-তা আপনাকে দেখতে তাে ভদ্র ছেলে মনে হয়। জেলে কেন?

-কীভাবে বুঝলেন আমি ভদ্র ছেলে?

চেহারা দেখে। অনেকটা মাসুম আর শান্ত মনে হয়। মনে হয় না

আপনি কোনাে অন্যায় করতে পারেন!

ইয়ামিন মৃদু হাসল। তারপর বলল,

-চেহারা দেখে মানুষ চেনা যায় না মিরাজ ভাই। চোর, চোট্টা, লুচ্চা,

লাফাঙ্গা, খুনিদের চেহারা নাকি বেশি মাসুম হয় গুণীজনরা বলেন। এরা

দেখতে যতটা মাসুম ভিতরে ততটাই কুত্তা আর হায়েনাদের মতাে হয়। ঠিক

মাকাল ফলের মতাে, উপরে ফিটফাট ভিতরে সদরঘাট।

মিরাজ মাথা নেড়ে বলল,

—হু তা ঠিক। তা আপনার বয়স কত?

২৭ বছর।

-খুব কম বয়স। আমার চেয়ে অনেক ছােট। এ বয়সে ভবিষ্যতে

কীভাবে সফল করা যায়, তার চেষ্টা করে সবাই। আর আপনি জেলে? তা

কী অন্যায় করেছিলেন?


ইয়ামিন পাশের সেলের দিকে তাকাতে তাকাতে বলল,

-কী করিনি? ড্রাগ ডিলিং, চোরাচালানি, অবৈধ হাতিয়ারের ব্যবসা,

চাঁদাবাজি, শেষমেশ দুজন পুলিশকে খুন করে ধরা পড়েছি। পুলিশ খুন তো।

আর ছােটখাটো কেস নয়! আর প্রমাণ সব আমার বিরুদ্ধে ছিল। তাছাড়া ।

এক পুলিশ হালায় মরতে মরতে আমার বিরুদ্ধে সব প্রমাণ দিয়ে গেছে।

ইয়ামিনের কথা শুনে ওর দিকে তীক্ষ্ণ নজরে তাকাল মিরাজ। ঠিক

তখন মিরাজের চোখের দিকে তাকাল ইয়ামিন। ইয়ামিনের চাহনিতে ভয়ে

মিরাজের শিরদাঁড়া বেয়ে যেন একটা হিমেল স্রোত বয়ে গেল। ইয়ামিনের

চোখ দেখে বােঝা যাচ্ছে ও যা বলছে সব সত্যি। কেন জানি মিরাজের

মতাে সাহসী ভয়ংকর দেখতে লােকটা, ইয়ামিনের মতাে শান্ত, সুশীল আর

শুভ্র চেহারার ছেলেটাকে ভয় পেল, খুব ভয় পেল। মিরাজ মনে মনে বলল,

-এ যে চেহারা নয়, অভেদ রহস্যেঘেরা কোনাে বস্তুর ন্যায়, যা দেখতে

সরল কিন্তু যার রহস্য ভেদ করতে গেলে গরলতায় পেঁচিয়ে শ্বাসরােধ হয়ে

মারা যেতে হবে!

ইয়ামিন মিরাজের দিকে তাকিয়ে হাসল। মিরাজ খেয়াল করল ভয়ে

ওর শরীরের লােমগুলাে দাঁড়িয়ে গেছে। ইয়ামিন মিরাজকে সামনের সেলে

দেখিয়ে বলল,

-মিরাজ ভাই পাশের সেলের ছেলেটা অত বিলাপ করে কাঁদছে কেন?

-ওকে হয়তাে শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দেবে। বয়স কম একদম। ঠিক

আপনার বয়সী। হয়তাে ২৫ কি ২৬ হবে।

-উনি কী করেছিল?

-হালায় তিনটা মেয়েরে রেপ করছিল। তার মধ্যে একটা এগারাে

বছরের বাচ্চা ছিল। বাচ্চাটা মারা গেছে। বাকি মেয়ে দুটো বেঁচে থাকলেও

তাদের কী অবস্থা তা তাে বুঝতেই পারছেন।

ইয়ামিন রাগী গলায় বলল,

—এসব লােকের তাে প্রকাশ্যে ফাসি হওয়া দরকার। যাতে পরে কেউ

অন্য মেয়েদের দিকে কুনজর দেওয়ার সাহস না পায়।

-আমিও পুলিশ অফিসারদের তাই বলেছিলাম। শালার আসল জিনিস

কেটে ভরা মজলিসে ফাসি দিন। মেয়েদের দিকে কুনজর দেওয়া

হারামজাদাদের দেখলে আমার মাথা গরম হয়ে যায়। শালারা শুধু একটা

মেয়ের জীবন নষ্ট করে না। সাথে পুরাে পরিবারটাকে ধ্বংস করে দেয়।


আকাম করে আবার ন্যাকা কান্না করছে। মিরাজ কান্না করা আসামি রানাকে

জোরে ধমক দিয়ে বলল, ওই হালার পাে কানতাছস কেন? যখন

মেয়েগুলারে রেপ করছিলি তখন এসব মনে ছিল না! মেয়েগুলার আর্তনাদ

তখন শুনতে পাসনি ভেন্ডির পাে। এখন কান্দন মারাস। চুপ কর, নইলে

তাের গলায় পাড়া দিয়া মাইরা ফালামু। রাইত দুপুরে ন্যাকামি কান্দন

মারাস। তিনডা খুন করে ফাঁসির আসামি হইছি চাইরডা করলেও সাজা

একই হইব।

রানা রেগে বলল,

-হালা ডােল কুত্তা। তােরা কত্তদূরের ভালাে? ভালাে হইলে তােরা

জেলে থাকতি না! শুনলাম তােগােও তাে ফাসি হতে পারে।

মিরাজ রেগে বলল,

-হ ভালাে না। তয় তাের মতাে মেয়েগাে জীবন নিয়া ছিনিমিনি

খেলিনি।

ইয়ামিন বলল,

-ভাই আপনারা চুপ করেন। যান ঘুমান। রাত তাে শেষ হতে চলল।

যে যার জায়গায় শুয়ে পড়ল। তিনজনেরই ধারণা হয়তাে তাদের ফাঁসি

হবে। মুখে তারা যতই বলুক না কেন যে মৃত্যু ভয় নেই, তবু পৃথিবীকে

ছেড়ে যাবার ভয়ে সর্বক্ষণ কাঁপছে তাদের প্রাণ। হয়তাে তারা খুব শীঘ্রই

পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করবে। তবু পৃথিবীকে ভালােবেসে গভীর আলিঙ্গনে

আঁকড়ে থাকতে চায় এ ধরণীতে। নিশ্বাস নিতে চায় প্রাণভরে। ইয়ামিন

ঠোটের কোণে মৃদু হেসে বলল,

—পৃথিবীটা বড় মায়ার স্থান। এ মায়া কাটানাের সাধ্য হয়তাে কারও

নেই।



ইয়ামিন জেলে কাটানাের কয়েক দিন পর একদিন সকাল দশটা। তখন

ইয়ামিনকে সুপ্রিম কোর্টে নিয়ে যাওয়া হয়নি। হয়নি শােনানাে ওর ফাঁসির

রায়। তখন ও বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী। সকাল দশটার দিকে

বরিশাল জেলখানার গেটের সামনে ছিপছিপে, রােগা-পাতলা গড়নের,

ফ্যাকাশে ফরসা একটা মেয়ে বসে আছে। বারবার ভিতরে যাবার অনুমতি

চাচেছ মেয়েটি। মেয়েটার নাম ‘প্রকৃতি ডি-রােজারিও। মেয়েটির চোখ

দুটো ঘােলাটে, বিমর্ষ আর অপেক্ষমাণ। ইয়ামিনের সাথে দেখা করতে

এসেছে প্রকৃতি।

বলা হয় এ মহাবিশ্বে ভালােবাসার উর্ধ্বে কিছু নেই। ইয়ামিন অবশ্য

সেটা মানতে নারাজ ছিল কোনাে একসময়! দুজন সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী চিন্তা

করা দুজন মানুষ। কিন্তু এ মহাবিশ্ব হয়তাে নতুন গল্প রচনা করতে বহু

কাঠখড় পুড়িয়ে ওদের মিলিয়েছে। প্রকৃতি মনে করে মানুষ মরে যায়, কিন্তু

এ মহাবিশ্ব ভালােবাসাকে মারে না। খুব যত্নে বাঁচিয়ে রাখে অনন্তকাল।

ভালােবাসা এ রহস্যময় মহাবিশ্বের আরেক মহারহস্য। যার রহস্য উন্মােচন

করতে গিয়ে কত কত লােক ভালােবাসা নামক মায়ায় আষ্টেপৃষ্ঠে

জড়িয়েছে। কেউ পেয়েছে, কেউ হারিয়েছে সবকিছু, কেউ জিতেছে, কেউ

হেরেছে। তবু ভালােবাসার রহস্য কেউ ভেদ করতে পারেনি। প্রকৃতি

ইয়ামিনকে সবচেয়ে বেশি ভালােবাসে। তবু ইয়ামিনের মৃত্যুদণ্ডের সাজা হতে

পারে জেনেও প্রকৃতি এতটুকো বিচলিত হয়নি, ঝরেনি চোখ থেকে দু'ফোটা

অশ্রু। কদিন পর জজের রায়ে ইয়ামিনের যে নিশ্চিত ফাসির শাস্কি হবে, তা

মােটামুটি সবাই জানে নয়তাে আন্দাজ করতে পেরেছে। কিন্তু সব

জেনেও প্রকৃতি ভাবলেশহীন। অবশ্য প্রকৃতির এ নিষ্ঠুরতায় ইয়ামিন

সামান্যতম অবাক হয়নি! ও হয়তাে জানে প্রকৃতিকে। ইয়ামিন এ-ও জানে

ওর ফাসি হবার দিনও প্রকৃতির চোখ থেকে এক ফোটাও অশ্রু ঝরবে না।


পরিচিতরা সবাই কাঁদবে হয়তাে, কিন্তু প্রকৃতি অশ্রুহীন চোখে দাঁড়িয়ে

দেখবে। ওর চোখ দুটো দেখলে মনে হবে চৈত্রের খরায়, পানিহীন ফেটে

চৌচির হওয়া কোনাে মাঠ। অথচ ইয়ামিন জানে, পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি

ভালাে ওকে প্রকৃতিই বাসে।

গতকাল থেকে প্রকৃতি ইয়ামিনের সাথে দেখা করতে বারবার

জেলখানার গেটের চক্কর কাটছে। দেখা করার পারমিশন থাকা সত্ত্বেও দেখা

করতে পারছে না। কারণ, ইয়ামিন দেখা করতে চায় না। জেলখানার

কারারক্ষী যতবার ইয়ামিনের কাছে গিয়ে বলেছে প্রকৃতি নামের কেউ ওর

সাথে দেখা করতে এসেছে ততবার ইয়ামিন অত্যন্ত বিনয়তার সাথে

বলেছে,

-ভাই তাকে গিয়ে বলবেন দেখা করে অতৃপ্তি বাড়ানোর চেয়ে মরে

গিয়ে অতৃপ্ত হৃদয় তৃপ্ততা পাবে। তাকে বলবেন মৃত্যু হবে আমাদের

মিলনপথ। মৃত্যুর পরই আমাদের হৃদয় তৃপ্ত হবে।

প্রহরীরা প্রথমে বেশ কয়েকবার বিরক্ত হলাে, ইয়ামিনের কথার

আগামাথা কিছু বুঝল না, তবু ওর কথায় কেন জানি তার খুব মায়া হলাে।

তাই প্রকৃতির কাছে গিয়ে সে-ও খানিক বিনয়ের সাথে ইয়ামিনের মতাে

করে বলার চেষ্টা করল, কিন্তু পেরে উঠল না। প্রকৃতি কারারক্ষীর কথা শুনে

কিছুক্ষণ ওখানে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। তারপর জেলখানা থেকে রাস্তার

ওপাশে থাকা দোকানে গেল, দু প্যাকেট সিগারেট, একটা দেশলাই, দুটো

এক লিটার করে সেভেনআপের বােতল, দুটো খাতা আর কয়েকটা কলম

কিনে দোকানের একটা টুলে বসে খাতায় কিছু লিখল। তারপর কারারক্ষীর

কাছে গিয়ে সেসব জিনিস, সাথে বড় একটা টিফিন ক্যারিয়ার দিয়ে বলল,

-দাদাভাই তাকে এগুলাে দিয়ে দেবেন দয়া করে।

আর পাঁচশ টাকা বের করে কারারক্ষীর হাতে গুঁজে বলল, এটা দিয়ে

আপনার বাচ্চাদের জন্য চকলেট কিনবেন।

কারারক্ষী ইয়ামিনের কাছে সকল জিনিস পৌঁছে দিল। ইয়ামিন বাকি

সব জিনিস পাশে রেখে খাতাটা তুলল। কয়েকটা পৃষ্ঠা ওল্টাতেই প্রকৃতির

হাতের গােটা গােটা অক্ষরে কিছু লেখা দেখল।

লেখা ছিল,

ইয়ামিন তুমি আমাকে, আমাদের সম্পর্ককে অতৃপ্ত রাখতে চাও কিন্তু

একদিন আমি বা আমাদের সম্পর্ক তৃপ্ত হবে কিন্তু তুমি থাকবে চরম


অতৃপ্তিতে। তােমার এ দার্শনিকতা আজ আমায় যতটা পােড়াচ্ছে, সেদিন।

তােমার অতৃপ্তি দেখে আমি ততটাই আনন্দ নেব। আর হ্যা, আমার সাদা।

টিউলিপ ফুল কবে পাচ্ছি?

চিঠিটা পড়ে ইয়ামিন মৃদু হাসল। অগােছালাে মনে কিছু কথা।

আওড়ালাে।

-পাগলী।

ভালােবেসে মনের কোণে দিলে আমায় স্থান,

বুঝলে না তাে পাগল আমি,

দুনিয়াবি যত মােহ থেকে মুক্ত!

বলেছিলাম বেসাে না ভালাে,

মানলে নাকো আমার কথা,

শুনলে নাকো কোনাে বারণ

করলে বারণ অবহেলা!

ভাসলে ভালাে, বুনলে আশা,

বুঝবে সখী এবার জ্বালা!

জ্বলবে তুমি, পুড়ব আমি,

ছাই হবে সব ভালােবাসা,

উড়ে যাবে সকল আশা,

অতৃপ্তিতে ভুগব আমি

দগ্ধ তুমি তবু হবে,

হৃদদহনের দগ্ধ লগনে,

চাইলে সখী টিউলিপ মালা!

সত্যি দুষ্ট তুমি!

পাগলী তুমি,

বােকা তুমি,

হিংস্র তুমি,

তবু ভালােবাসাময় আমার হৃদমােহিনী।

ঝটপট খাতায় কথাগুলাে লিখে ফেলল ইয়ামিন। প্রেমে পড়লে কিছু ছেলে

র মধ্যে আপনা-আপনি কবিত্ব চলে আসে বােধহয়। অথচ একসময় কবিতা


ইয়ামিনের চরম অপছন্দের ছিল। প্রকৃতির হাতের লেখা অংশটায় বেশ।

কতগুলাে চুমাে খেল ইয়ামিন। প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে

ধোঁয়া আকাশপানে ওড়াতে ওড়াতে টিফিন বাটিটা খুলল। তিনটা বাটি। এক

বাটিতে চিকন চালের ঝরঝরে ভাত। আরেকটাতে বড় বড় চিংড়ি মাছ নার

কেল বাটা দিয়ে ভুনী করা, এক বাটিতে দুই রকমের শাক ভাজি, আর দুরক

মের ভর্তা বােধ হয় চিংড়ি আর টাকি মাছ ভর্তা, আরেকটায় কষা করে

গরুর মাংস, আর ছােট্ট একটা প্লাস্টিকের বাটিতে ঘন দুধ দিয়ে আঠালাে

করে রান্না করা ফিরনি, উপরে কাজু, কিশমিশ আর কাঠবাদামের ছড়াছড়ি।

এগুলাে যে ইয়ামিনের পছন্দের খাবার তা নয়, সবই প্রকৃতির পছন্দের, কিন্তু

ইয়ামিন এসব খাবার তৃপ্তি করে খাবে।

অনেক দিন পর ইয়ামিন পেটপুরে খাবার খেল। খাবারটা ও একা

খেয়েছে তা নয়, মিরাজ আর জেলখানার দুজন কারারক্ষীর সাথে ভাগাভাগি

করে খেয়েছে। খাবারটা খেয়ে বেশ তৃপ্তি পেয়েছে ইয়ামিন। জেলে যে

খাবার দেয় তাতে যে ওর পেট ভরে না তা নয়, কিন্তু জেলের খাবারগুলাে

যে, স্বাদহীন। আর তাছাড়া প্রকৃতির মায়ের হাতের রান্না ওর খুব ভালাে লাগে।

প্রকৃতি রান্না করতে পারে না। প্রকৃতির মা ভালাে রাঁধলেও তিনি রান্না করতে

পছন্দ করেন না। এ রান্নাগুলাে যে প্রকৃতি ওর মাকে দিয়ে জোর করে রান্না

করিয়েছে, তা ইয়ামিন বেশ বুঝতে পারছে।

যখন ইয়ামিনের বয়স ষােলাে কি সতেরাে হবে। তখন ওর সংসার

এবং বিয়ে করার প্রতি খুব আগ্রহ ছিল। বিষয়টা হাস্যকর লাগলেও ও ছােট্ট

একটা স্বপ্ন দেখত, ওর ছােট্ট একটা ঘর হবে, ওর স্ত্রী প্রতিদিন ওর পছন্দের

খাবার রান্না করবে আর ও তার সামনে বসে তৃপ্তি করে খাবে। মাঝে মাঝে

নিজেও স্ত্রীকে খাইয়ে দেবে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে ইয়ামিনের স্বপ্নটা

স্বপ্নেই মিইয়ে গেল। অবশ্য ওর এ স্বপ্নের কথা কখনাে প্রকৃতিকে বলেনি।

হয়তাে আর গিয়েও বলতে পারবে না। এখন তাে ও জানে ওর হাতে আর বেশি

সময় নেই। শীঘ্রই হয়তাে সমাপ্তি হবে জীবন নামক পথচলার। আর সাথে

সমাপ্ত হবে প্রকৃতির সাথে জড়িত সমস্ত অনুভূতির।

খাবার খাওয়ার পর মিরাজ বলল,

-ইয়ামিন ভাই খাবারটা কিন্তু খুব মজা হয়েছে। কে পাঠিয়েছে?

আপনার মা?

-না।


-আপনার স্ত্রী?

—আমার বিয়ে হয়নি।

-তবে?

-বলেছিলাম না। যে আমাকে সবচেয়ে বেশি ভালােবাসে। প্রকৃতি।

—আপনার প্রেমিকা?

—হয়তাে! হয়তােবা না।

-বুঝলাম না।

—আমাদের মধ্যে যা আছে তা আদৌ প্রেম বা ভালােবাসা কি না, তা

আমি বা প্রকৃতি দুজনের কেউই জানি না। আমরা শুধু একে অপরকে বােঝার

চেষ্টা করি, সম্মান করি, একে অপরের সাথে থাকলে পরিপূর্ণবােধ করি,

ভালােবাসি, তবে আমাদের এ সম্পর্কের কোনাে নাম হয় কি না, তা আমি

অন্তত জানি না।

-ভালােবাসলে তাে প্রেমিকাই হলাে।

জরুরি নয় যে ভালােবাসলে সে প্রেমিকা হবে। প্রকৃতি আমাকে

ভালােবাসে, প্রচণ্ড ভালােবাসে। আমিও প্রকৃতিকে অনেক ভালােবাসি, তবে

আমার সে ভালােবাসা অপ্রকাশিত, অতৃপ্ত। আমি যদি জেলে না আসতাম,

বা ভালাে ছেলে হতাম তবু সমাজ, ধর্ম হয়তাে আমাদের ভালােবাসার

স্বীকৃতি দিত না!”

-কেন?

-প্রকৃতি ক্যাথলিক ধর্মের।

-মানে খ্রিস্টান!

-হুঁ।

-ভালােবাসলেন তা-ও অন্য ধর্মের মেয়েকে।

-ভালােবাসা কবেই বা ধর্ম, জাতি, বর্ণ, গােত্র দেখেছিল। ইতিহাস

ঘাটলে বহু অমর প্রেম পাওয়া যাবে, যাদের ভিতর ধর্মের দেয়াল প্রধান

বাধা ছিল । তবু তারা ভালােবেসেছিল। আর আমরা তাে ভালােবাসলেও সে

ভালােবাসা হয়তাে অপ্রকাশিত। এ সম্পর্ককে প্রেমিক বা প্রেমিকাদের

নামভুক্ত করা হয়নি, হয়তাে হবেও না। হয়তাে হবে না কোনাে নথিভুক্ত

সম্পর্ক আমাদের।

মিরাজ চুপ করে রইল খানিক সময়। আর মিরাজের তীক্ষ্ণ, রুক্ষ।

চেহারাটায় কেন জানি কোমলতার ঝলক ফুটে উঠেছে। ওর চেহারা ততটা


রুক্ষ দেখা যাচ্ছে না, যতটা কঠিন সব সময় দেখা যায়। ইয়ামিন মিরাজের

দিকে তাকিয়ে বলল,

-আমার অতৃপ্ত ভালােবাসার গল্প শুনে আপনার মন খারাপ হলো?

সুখ,

-তবে?

-ভালােবাসা শব্দটা শুনে।

-কেন?

-কত ছােট্ট শব্দটা কিন্তু গভীরতা ঠিক আকাশের মতাে বিশাল। অথচ

কিছু মানুষ এর মূল্যই বােঝে না। একেকজনের কাছে ভালােবাসার একেক

রকম ব্যাখ্যা। তােমার কাছে অপ্রকাশিত বা অতৃপ্ত, আমার কাছে পরিবারের

নিজের স্ত্রীর খুশি ছিল। অথচ আমার স্ত্রীর কাছে...!

-আপনার স্ত্রীর কাছে?

–বিকৃত নােংরা যৌনতা।

-মিরাজ ভাই আজ বলুন তাে কেন আপনি আপনার স্ত্রীকে খুন করে

ছিলেন? তিনি কি পরকীয়ায় জড়িয়ে ছিলেন?

-শুধু পরকীয়ায় জড়ালে ওকে আমি তালাক দিতাম বা অন্য কোনাে

উপায়ে শাস্তি দিতাম, খুন করতাম না। ও নােংরামিতে জড়িয়েছিল ।

-কী নােংরামি?

-এটা যখন শুনেছ যে, আমি আমার স্ত্রীকে হত্যা করেছি, তখন এটাও

নিশ্চয়ই শুনেছ আমার স্ত্রীর সাথে আমার বড় আপা ও দুলাভাইকেও খুন

করেছি।

-হা শুনেছি। কিন্তু কারণ জানি না। আপনার কথায় মনে হলাে

আপনার বড় আপাকে আপনি অনেক বেশি সম্মান করতেন ঠিক মায়ের

মতাে। ভালােবাসতেন খুব। তবে এ খুনখারাবি কেন?

-বড় আপা, দুলাভাই, আর আমার স্ত্রী ঝুমুর তিনজন মিলে নােংরামি

খেলা শুরু করেছিল!

-মানে?

-আমার বড় আপা আমার চেয়ে পাঁচ বছরের বড়। তার স্বামী তার

চেয়ে দুই বছরের বড়। নয় কি দশ বছর আগে তাদের বিয়ে হয়েছিল। দুই

সন্তানের জননী বড় আপা। আমার আর ঝুমুরের বিয়ের বয়স আড়াই বছর।


আমাদের কোনাে সন্তান নেই। আমার স্ত্রী আর আমার দুলাভাই দুজন।

পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েছিল।

-তাতে আপনার আপার দোষ কোথায়?

-আমার স্ত্রীকে পরকীয়ায় জড়াতে বাধ্য করেছিল আমর আপা।

-মানে?

-কথাগুলা খুব লজ্জার এবং নোংরা, বলতে মুখে আটকে যায়। হয়তো।

আপনি বিশ্বাসও করবেন না। তবু বলব। হয়তাে আজ বাদে কাল মারা

যাব, মারা যাবার আগে কাউকে নিজের মনের কথা বলে যেতে চাই।

আমার আপা আর দুলাভাইয়ের নাকি বহু বছরের বিবাহিত জীবনে

যৌনতায় একঘেয়েমি লেগে গেছিল। দুলাভাইয়ের সাথে বেশ ফ্রি ছিলাম।

যার কারণে তিনি মাঝে মাঝেই মজা করে বলতেন যৌনজীবন

একঘেয়েমিতে ভরে গেছে, নতুন কিছু ট্রাই করতে চান। তিনি নাকি

ইন্টারনেটে বিভিন্ন ১৮+ সাইটে উত্তেজনামূলক, নতুন নতুন সব যৌনতায়

ভরা গল্প পড়েন, ভিডিও দেখেন। তার কথাগুলাে বিচ্ছিরি লাগলেও মজা ভেৰে

উড়িয়ে দিতাম। যেটা ছিল আমার প্রথম ভুল।

তারা নতুন উত্তেজনামূলক কিছু করতে চেয়েছিল। যার উপায় হিসেবে

ইন্টারনেট সার্চ করে বিভিন্ন ধরনের সেক্সের ভিডিও এবং গল্প পায়, এবং

তারা সেটা অ্যাপলাই করতে চায়। আর তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে আমার স্ত্রীকে

ফাসায়। আমার স্ত্রী যে সরল সহজ তা নয়। ওর যৌনক্ষুধা একটু বেশি তা

আমি জানতাম কিন্তু ও সব সময় বলত, আমাকে দিয়েই ও তৃপ্ত। দু'জনের

সংসার খুব ভালােই চলছিল। বছর খানেক আগে বাবা মারা যান, মা তাে

গত তিন-চার বছর আগে। আমরা তিন ভাইবােন। ছােট বােন স্বামীর সাথে

লন্ডনে থাকে। দেশে তেমন আসে না। পরিবারের বাড়তি কোনাে লােক

নেই। আমি আর ঝুমুরই থাকতাম আমাদের ফ্ল্যাটে। আমার বাবার বাড়ি

ফ্ল্যাট কিনি।

আছে কিন্তু সেখানে বছরে দু-একবার যাওয়া হয়। কাজের সুবিধায় শহরে

মাঝে মাঝেই আমি ব্যবসার কাজে শহরের বাইরে বা ঢাকা যেতাম।

সেদিনও শহরের বাইরে গিয়েছিলাম। বাড়ি ফেরার কথা ছিল না। কিন্তু

কাজ না থাকায় ফিরে এসেছিলাম। আসলে ফিরে আসাটা উচিত হয়নি। না

ফিরলে হয়তাে অমন নােংরা দৃশ্য দেখতে হতাে না। রাত বারােটায় বাড়ি

ফিরলাম। ফ্ল্যাটের দরজায় নক না করে নিজের কাছে থাকা চাবি দিয়ে

দরজা খুলে ভিতরে ঢুকলাম। ভাবলাম ঝুমুরকে সারপ্রাইজ দেব। কিন্তু

নিজেই বড় সারপ্রাইজ পেলাম। রুমে গিয়ে দেখলাম আমার স্ত্রী, বড় আপা,


দুলাভাই তিনজনই নগ্ন আর আদিম নােংরা খেলায় মত্ত । মাথা ঠিক রাখতে

পারলাম না। সবগুলাকে বাংলা দা দিয়ে কুপিয়ে শেষ করে দিলাম। তারপর

নিজেই পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করলাম। .

মিরাজের কথা শুনে ইয়ামিন অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। এ

ধরনের ঘটনা শুনলে কথা বলার মতাে ভাষা হারিয়ে যায় । একটা দীর্ঘশ্বাস

ছেড়ে ইয়ামিন বলল,

—আজকের পৃথিবীতে সম্পর্কটা নােংরামিতে ঢেকে গেছে। ইন্টারনেট

আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, সাথে কিছু বিষয়কে অত্যন্ত জটিল ও

নােংরা করেছে। নােংরা ছবি, ভিডিও এবং গল্পে ভরে গেছে, সোশ্যাল

নেটওয়ার্কিং সাইটগুলাে। কিন্তু কিছু করার নেই। প্রতিটা জিনিসের

নেগেটিভ-পজিটিভ দিক থাকে। সেটা আমাদের বেছে নিতে হবে কোনটা

গ্রহণ করব কোনটা বর্জন!

ইয়ামিন ভাই এতটা বােঝেন তবে আপনি কেন আজ নষ্ট পথে?

ইয়ামিন মাথা নিচু করে বলল,

-আজ নয়, কোনাে একদিন বলব, যদি বলার মতাে সময় পাই।

-আচ্ছা তবে আপনার আর প্রকৃতি আপার পরিচয়, প্রণয় কীভাবে

হলাে তা তাে বলেন।

হাসল ইয়ামিন। তারপর বলল,

-এত আগ্রহ কেন মিরাজ ভাই?

—আসলে দুজন ভিন্ন ধর্মের মানুষ যখন কোনাে সম্পর্কে জড়ায় তখন

ভিতরে বহু ইন্টারেস্টিং ঘটনা ঘটে, সেগুলাে শুনতে ইচ্ছে করছে।

ইয়ামিন মৃদু হেসে বলল,

-জানতাম। এমনই উত্তর হবে।