গোরখোদক খন্দকার উলাস
কদমতলি গােরস্থানের একমাত্র গােরখােদক
মতিয়ার হােসেন অরফে মতি। কিভাবে এই
পেশায় আগমন মতির। তার স্মৃতি আজ
অস্পষ্ট। তার যতটুকু মনে পরে কদমতলি
গােরস্থানের পূর্বের গােরখােদক 'ওস্তাদ হাফিজ
এর হাতে তার এইকাজে হাতে খড়ি।
একাকিত্বের জীবনে মতির একমাত্র সঙ্গি কহিনূর।
কিন্তু সমাজের জটিল বাস্তবতার সমীকরণ ও
অবস্থান তাদের অলিখিত সম্পর্ক চিরঞ্জীব রূপ।
দেয়নি।
সমাজের পর্দার অন্তরালে লুকোনাে চরিত্রের নাম
গােরখােদক। যার নেই কোন পেশাদারিত্ব।
কিন্তু জীবনের চরম সত্য মৃত্যুকে প্রতিটি
মানবসভ্যতার মেনে নিতে হয়। আর শেষ।
যাত্রায় আমাদের জন্য চিরস্থায়ী ঠিকানার
রূপকার
যিনি
হলেন। একজন
"গােরখােদক।"
পর্দার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই চরিত্রের কথা
আমরা কখনাে ভাবি না বা ভাবনার প্রয়াসও
করি না। যে চরিত্র আমাদের সমাজের অসংখ্য
মানুষের শেষ অবাস গড়েন তার নিদারুণ
নিপূনতায়। তেমনি একটি চরিত্র আমাদের
চোখের আড়ালে "গােরখােদক।" যে চরিত্রটি
সব সময়ই আমাদের চোখের আড়ালে থেকে
যায়।
লেখক সেই চরিত্রটি তুলে ধরেছেন এই বইয়ে।
বাস্তব নির্ভর কাহিনী নিয়ে রচিত বই
"গােরখােদক।"
বইটি পাঠক সমাজের এক নতুন সৃষ্টি। অনেক
অজানা চরিত্র আমাদের আড়ালে থাকে।
লেখক, তেমনি কিছু চরিত্রের মাঝ থেকে
"গােরখােদক" কে তুলে এনেছেন পাঠকদের
জন্য।
লেখকের জন্য রইলাে অনেক অনেক শুভ
কামনা। বইটি পাঠক প্রিয়তার শীর্ষে থাকুক
এই আশায়,
না।
উৎসর্গ..
আমার বটগাছ সমতুল্য দাদু খন্দকার।
ইসহাক আলী এবং পরােপার থেকে
উৎসাহ যােগানাে নানি খন্দকার জাহানারা
বেগমকে গােরখােদক উৎসর্গ করলাম।
------------------------------
আঁধারটা আজ বেশিই কৃষ্ণবর্ণ যেন গিলে খেতে চায় হঠাৎ
শিয়ালগুলাে রাতের আর্তনাদের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে, প্রচুর ক্ষুধা নিয়ে
প্রতিদিন রাত আসলেই তারা আর্তনাদে মাতে। এই রাত, শেয়ালের
আর্তনাদ, মৃত মানুষদের কবরগুলাে এসবই সঙ্গী গোরখোদক মতি
মিয়ার। পুরাে নামটা তার আজ মনে পড়েনা, কিভাবে এ পেশায় তার।
আগমন শুধু এটুকু মনে পড়ে।
গন্ডগােলের বছরের মাঝে অজ্ঞাত জায়গা হতে বয়স তখন তার।
আনুমানিক পাঁচ বছর হবে এমন একটি নাম নাজানা স্থান হতে তুলে
এনেছিল তার ওস্তাদ হাফিজ উদ্দিন শেখ, সে বার নাকি প্রচুর মানুষ।
মারা গিয়েছিল, হাফিজ নিজ হাতেই অজ্ঞাতনামা সেই সকল মানুষের
লাশ দাফনের কাজ করত। একদিন একজোড়া লাশের পাশে পাঁচ
বছরের এক শিশু বাচ্চা দাঁড়িয়ে কাঁদছিল, সেখান থেকেই তারপর
স্বজনহীন হাফিজ নিজ হাতে তাকে লালন পালন করে আজকের
মতিয়ার হােসেন অরফে মতি বানিয়েছে। পরে একসময় গন্ডগােল থেমে
গেল ছােট্ট মতি এগুলাে কিছুই বুঝতােনা খালি হাফিজ উদ্দিন ওস্তাদ
একদিন এসে বলল, “বুঝলি রে মতি আজ থেকে মানুষ স্বাধীন দেশে
নিশ্চিন্তে মরতে পারবে, নিশ্চিন্তে ঘুমাইতে পারবে,” মতি সেইদিন
ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে শুনেছিল সেইসব কথা, অজ্ঞতায় মর্মার্থ সেদিন।
বােঝেনি।
গন্ডগােলের পর থেকে গােরখােদক হাফিজের সাথে মতির
জায়গা হয় কদমতলি গােরস্থানে আজও সেখানেই আছে, কদমতলি।
গােরস্থানের মূল খাদেম এখন মতি। গন্ডগােলের দুই বছরের মাথায়
তার ওস্তাদ হাফিজ উদ্দিন দুরারােগ্য ব্যাধিতে ইন্তেকাল করে, মূলত
হাফিজের কাছেই মতির কবর খোঁড়ার হাতেখড়ি, আজও মতি সেই
কাজই করে।
গ্রামের নামেই গােরস্থানের নাম হয়েছে কদমতলি গােরস্থান।
এই গােরস্থানে মতির কাজের জন্য নাই কোন বরাদ্দ, নাই থাকার
জায়গা বিভিন্ন জাইগীর তারে মসজিদের ইমামের মত পালা করে
(২২
খাওয়ায়।
গােরস্থানের এক কোনে টিনের ছাপরা, চারিদিক খােলা শুধু বৃষ্টি
ঠেকাতে মাথার ওপর চালটুকু আছে। তার নিচেই বাঁশের মাচায় মতির
সারাদিন- এমনকি রাতও কাটে, হঠাৎ মৃত্যুর সংবাদ এলেই মতির ডাক
পড়ে, ব্যস্ততা বাড়ে। গােরস্থানের ছাপরা হতে দূরে নদী দেখা যায় ছােট
নদীতে নৌকার সারি। সকাল হলেই বটতলায় হাট বসে তবে রাতের
নিস্তব্দ নদীর কোমল ঢেউয়ের ধ্বনিটাও আজ মতি মিয়ায় অতি
নিকটতম কেউ, নিস্তব্ধ রাতের পরিবেশ মতির জীবন ধারায় অংশে
পরিণত আজ। হঠাৎ মৃদু হাওয়ায় কবরস্থানের এক কবরের ঝাড়খন্ডের
মাঝে নড়েচড়ে ওঠে কিছু, মতির সতর্কদৃষ্টি সেদিকে তাকায় তারপর
তার অনুভূতিতে মনে হয় এই বােধয় লাশটা কবর থেকে উঠে আসছে।
কিছু সময় বাদেই গােড়মুখ হতে একটি বেজি বাহির হয়ে আসে, মতির
স্মৃতির বিভ্রাট ভাঙ্গে আনমনে সে নিজ মনেই নিজের আহাম্মকের মত
ভয় উৎপাতের জন্য হাসে, এগুলাে তাে প্রতিরাতে নিস্তব্দ গােরস্থানের
আলামত! তবে তার ভয়ের উৎপাত কেন?
হঠাৎ মাঝে মাঝে মনে হয় রাত নামলেই কবরের লাশগুলাে।
তাকিয়ে থাকে তার দিকে। নিস্তব্দ রাতের আগমন হলেই পুরাে
কদমতলিতে শুধু একজোড়া চোখই নির্ঘম কাটায় আর সেই চোখ
জোড়াই হল মতির চোখ। তারপর রাতের আঁধার কাটে ভােরের আলাে
ফোটে, মােরগের ধ্বনির সুরে জেগে ওঠে প্রকৃতি, দূর হতে
মােয়াজ্জিনের মিষ্টি কণ্ঠে আস-সালাতু-খয়রুম্মিননায়াম ধ্বনি শােনা
যায়।
মতি প্রতিদিনের ন্যায় নদীর স্নিগ্ধ শীতল পানিতে হাত-মুখ ধুয়ে
অজু করে পার্শ্ববর্তী কদমতলি মসজিদে ফজরের নামায আদায় করতে
যায়। কদমতলী মসজিদের ইমাম সাহেবের নাম নাজিমুদ্দিন মােল্লা,
তিনি নামায পড়ান এবং মােয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করেন। মাঝে
মাঝে বিভিন্ন হাদিসের বানী শােনান মতিকে, কিছু সময় যদি তিনি ভুল
বয়ানও দেন তবে মতি সেইটা অবলীলায় মেনে নেয়।
একদিন হঠাৎ করে নাজিমুদ্দিন মােল্লা বলে বসে “মতিয়ার
তােমার কাজকর্মে কোন মন নাই দ্যাখতাছি কতােদিন যাবৎ মসজিদের
উঠোনে ঝাড় জংগল হইয়াছে তার ব্যাবস্থা নিতেছনা এদিকে
গােরস্থানের পয়-পরিষ্কারের অবস্থাও ভালাে না দ্যাখতাছি, এমন হইলে
চলবাে? কি জবাব দিবা মরার পর, বলি তােমার কি মরনের ভয়টাও
কইমা গেছে!”
মতি হতবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে বলে,“জি হুজুর! আগামী
জুম্মাবার সব ঠিক কইরা ফালামু, বেয়াদবি মার্জনা করিবেন আল্লাহর
ওয়াস্তে,” নাজিমুদ্দিন মােল্লা গলার আওয়াজে গাম্ভীর্য এনে বলে, “ঠিক
আছে ঠিক আছে এমন অবহেলা যেন আর দ্বিতীয়বার না দেহি” মতিয়ায়
ভাবে তার ভুলগুলাে কিন্তু কিছুই ক্রটি খুঁজে পায়না তারপর অবলীয়ায়
পুরােনাে বাস্তবতায় ঘােরে ফেরে। এই জগৎ মতিকে শুধু সৃষ্টিকাল হতে
দিয়েছে লাঞ্চনা যেন সকল কাজের জবাব দিহিতাই তার, সে শুধু।
আদেশ গ্রহনেই ব্যস্ত কখনও দিতে শেখে নাই। ফজরের নামাযে
মুসল্লীদের সংখ্যা খুবই নগণ্য। আজকাল ঘুম ভেঙ্গে ইবাদত করা
মানুষের বড়ই অভাব, তাই বেশিরভাগ দিন মতি আর ইমাম সাহেব
নাজিমুদ্দিন মােল্লা জামাতে নামায আদায় করে। তারপর মতি যায়
নদীতীরের বটতলার হাটে সেখানে ফরিদের চায়ের দোকানে হয় সস্তায়
কেনা কপিলউদ্দি বিস্কুট ও টলটলে লাল-চা দিয়ে সকালের নাস্তা।
এরপর কোন এক জায়গীর বাড়ি হতে মতির জন্য সকালের খাবার নিয়ে
আসে। বেশির ভাগ দিনেই জোটে পান্তাভাত, তবে ঈদে চাঁদে এর
পরিবর্তন হয়ে ভালাে খাবারও জোটে। আবার যদি কোন মুর্দা দাফনের
চল্লিশ দিন অতিবাহিত হয় তবে মুর্দার বাড়ি হতেও তারে ভরপেট
খাওয়ার দাওয়াত থাকে।
সেইবার কদমতলীর সভ্রান্ত পরিবার মাতব্বর বাড়ির ফালু।
মাতব্বরের ইন্তেকাল হলে খুব ভালাে খাবারের আয়ােজন হয়েছিল ।
মহিষ জবাই দিয়ে চল্লিশ গ্রামের মানুষকে খাওয়ানাে হয়েছিল । শেষে
ফিরনীর ব্যবস্থাও ছিল, কলাপাতায় খাবারের ব্যবস্থা, মতি আর
কদমতলি জামে মসজিদের ইমাম নাজিমুদ্দিন মােল্লা একসাথে দাওয়াতে
গিয়েছিল, খুব খাতির যত্ন হয়েছিল তাদের। দীর্ঘ দিন বাদে মতি
সেইদিন দুপুরের খাবার পেটপুরে খেয়েছিল।
২
চায়ের দোকানী ফরিদ বেশির ভাগেই ফ্রিতেই নাস্তা করায়
মতিকে, “মতি ভাই কেমন আছাে নি”? মতি বলে “ভালা আছিরে বাই,
দে দুইখানা কপিল উদ্দিন বিস্কুট আর চা ।” কদমতলীর মাঝে একমাত্র
ব্যক্তিত্বই হল ফরিদ যার সাথে মতির দীর্ঘদিনের সখ্যতা, অনেক গল্প
হয় ফরিদের সাথে, তার বেশির ভাগ জুড়েই থাকে ধর্মীয় আলাপচারিতা,
“বুঝলি রে ফরিদ এই দুনিয়া কিছু লয়, যাইতে একদিন হইবাে।
মানুষ কত্তো টাহা খরচায় প্রাসাদ বানায় বেজায় সুন্দর এই-ধর ফালু
মতব্বরের কথা দীর্ঘদিন বিদ্দেশে থাইক্যা আইলাে, বিশাল অট্টালিকা।
বানাইলাে খাওনের ভাগ্যি আর হইলাে না।” ফরিদ মনােযােগ দিয়ে
মতির কথা শােনে, একসময় বলে ওঠে, “বাদ রাহাে মতিভাই, একটু
সাদ আল্লাদের কথা কও হুনি বিয়াসাদী তাে কিছুই করলানা। সারা
জীবন কাটায় দিলা কদমতলী গােরস্থানে”, মতি ফরিদের কথা শুনে মজা
পায় বলে “নারে ফরিদ সেইডা আমার জন্যি না।”
সূর্যটা রক্তবর্ণে রূপান্তর হতে শুরু করেছে, মতি তার চালায়
ফিরে আসে। জায়গীর বাড়ি হতে খাবার এসেছে এক বাটি পান্তা সাথে
পেঁয়াজ, মরিচ। কহিনূরদের বাসা গােরস্থান হতে দুই কদমের পথ,
মাসের পনেরতম দিনে তাদের বাসা হতে খাবার আসে, কহিনূরের বাবা
হালচাষী, বিঘাদশেক জমির গেরস্থ। দুইটা গরু আছে হালের, একটা।
গাভী আছে সেইটা দুধ দেয় প্রতিদিন। বলতে গেলে কদমতলীতে
কহিনুরদের অবস্থা খারাপ নয়, কহিনূরের ছােট্ট একটা দশ বছরের
বােন আছে সেই প্রতিনিয়ত মতির চালায় খাবার পৌছায় কহিনুরের
বােনের নাম পারুল মতির সাথে তার সখ্যতা ভালােই জমে, “কি রে
পারুল খাওন নিয়ে আইসােস, পান্তা আর কতদিন চলবাে ভালাে খাওন।
আনতে পারছ না?”“যেইডা জোটে এইডাই খাইয়া আমারে উদ্ধার
করােতাে মতি ভাই। বুজি বাইচা থাকলে তােমার জন্যি এতটুহুন ও
জুটতাে না, খালি তাে বইস্যা খাওন তােমার কাম,” মতি পারুলের মুখে।
এমন কথা শুনে খুব মজা পায়। তারপর তৃপ্তি ভরে পান্তা খেয়ে ঘুমের
প্রস্তুতি নেয়, সারা পৃথিবী যখন জাগে মতি তখন নিজ চালায় ঘুমােয়।
সচরাচর স্বপ্ন দেখে রঙিন সেই স্বপ্নে আবার কহিনূর আসে, এসে বলে।
“মতি ভাই বেলা কইরা ঘুম আর কতাে ঘুমাইবা একটু খায়েশের সখ
আল্লাদ কবে হইবাে তােমাগাে?”
দ্রিার ঘাের চাপে মতি ঘুমের রাজ্যে যেতে চায়, দূর থেকে হঠাৎ
চিল্কারের সুর ভাসে আবছা, মতিয়ার আছে নাকি! মতিয়ার,
আওয়াজধীরে ধীরে গাঢ় হতে চলে “আরে ও মতিয়ার” ঘুমের ঘাের
ভেঙ্গে মতিয়ার জেগে ওঠে বলে “কিডা গাে, আমি চালায় আছি,” দূর
থেকে গামছা গলায় পাশের গ্রামের সালাম মাঝিকে ছুটে আসতে দেখা
যায়। কাছে এসে হকচকিয়ে বলে “আরে মিয়া এখন ঘুমাইতাছাে, খবর
রাহাে না? আমাগাে গ্রামের হামিদের আব্বায় মইরা গেছে , বাদ যােহর
কবরস্থ করণের সময় নির্ধারণ হইছে গাের খননের কাজ শুরু করাে।”
মতি আবারাে আড়মােরা ভেঙ্গে উঠে বসে পুনরায়, নদীর দিকে ছুটে
চলে। হাত-মুখে পানি দিয়ে জড়তা কাটিয়ে চালা হতে কোদালকাস্তে নিয়ে গােরস্থানের পূর্বকোণের দিকে রওনা হয়।
ওস্তাদ হাফিজ
কদমতলি গােরস্থানের পুরানাে গােরখােদক, বংশ পরম্পরায়।
এই কাজ হাফিজদের পরিবারে চলে আসছে, গাের খননের কাজ করে।
নাগাদ সূচনা হয়েছিল তার ইতিহাস হাফিজের কাছে ধোঁয়াশা। শুধু
লােকমুখে শােনা যায় হাফিজের বাবার কাছে এই কাজের হাতেখড়ি
তার। পরবর্তিতে সংসারের বালায় তার পূর্বপুরুষরা জড়ালেও হাফিজের
আর সেই পথে পা বাড়ানাে হয় নাই, গ্রামবাসীর অনুরােধে একবারও
হাফিজ সেই পথ অনুসরণের প্রচেষ্টা করে নাই তাও বলা ঠিক হবে না
কারণ যেইবার সংসারে পা দেবার সম্মুখীনে অবস্থান করার সিদ্ধান্তে
উপনিত হয়েছিল হাফিজ সেইবারই দেশে শুরু হয় গন্ডগােল। চারিদিকে
শুধু গুলির আওয়াজ এখানে সেখানে, নদীতে শুধু লাশ আর লাশ।
প্রতিনিয়ত মানুষ মেরে ফেলছে ভীনদেশিরা, প্রতিটা জায়গায় শুধু
গন্ডগােলের আলােচনা। অজোপাড়গাঁ নদী বিধৌত অঞ্চল কদমতলি ।
লােকমুখে হাফিজ শােনে যারা মানুষ মারছে তারা নাকি পাক-বাহিনী
নামে পরিচিত, অনেক দূর থেকে এসে এই অঞ্চলটা নিজেদের বলে
দাবি করছে কিন্তু এ অঞ্চলের মানুষগুলাে তাদের সেই অন্যায় দাবি
মেনে নিতে নারাজ তাইতাে যুদ্ধ করছে। কদমতলিতে যুদ্ধের রেশ
এখনাে এসে পরে নাই। তবে কদমতলির আশেপাশের গ্রাম থেকে খবর
আসে, মধ্যরাত্রিতে তাণ্ডব চালানাের খবর।
এক রাতে হাফিজ গােরস্থানের মাচায় বসে সস্তায় কেনা।
আকিজ বিড়ি ফুকছে, সবে মাত্র রাতের খাবার শেষ করে আরামের।
সুখটান যেই দিয়েছে তারকিছু সময় বাদেই নদীর ওপরের গ্রামে
আগুনের লেলিহান শিখা দেখা যায়, সাথে মানুষের গগণ বিদারি
চিক্কার, বাচ্চাদের কান্নার আওয়াজ, মহিলাদের আর্তনাদ। হাফিজ
বাকশক্তি হারানাের মত শুধু চেয়ে দেখে কখন হাতের জ্বালানাে বিড়িটা
নিভে গেছে সেইদিকে যেন খেয়ালই নেই হাফিজের। সারাটা রাতভর
গ্রামে আগুনের লেলিহান শিখা জ্বলে, মাঝ রাত্রিতে প্রচন্ড গুলির
আওয়াজ শােনা যায়।
পুরাে কদমতলি গ্রাম যেন রাতের আঁধারের সঙ্গে মিশে নিস্তব্ধ
হয়ে গেছে, আতংকে জড়সরাে অবস্থায় অবচেতন পুরাে গ্রাম কোন
বাড়িতে কুপি পর্যন্ত জ্বলছে না। পুরােটা অঞ্চল আজ একটি গােরস্থান,
এত লাশ দাফন একা হাফিজের পক্ষে সম্ভব নয় তাই শকুন আর
শিয়ালগুলােই ভরসা। একসময় রাত্রি কেটে আলাে ফোটা শুরু হয়েছে
সকাল আসছে, বিমর্ষ সকাল ।
নদীর ওপারের আর্তনাদ থেমে গেছে এখন চারিদিক নিস্তব্ধ,
মানুষ মারা যন্ত্রগুলাে নিয়ে ভীনদেশিরা চলে গেছে। সকাল হতেই
নদীপথ পেরিয়ে কদমতলির মানুষগুলাে ঐ পাড়ের গ্রামের দিকে রওনা
হয়েছে, প্রতিটি নৌকায় শুধু মানুষের মাথা দেখা যায়, তারা ছুটছে।
ওপারে স্বজনের খোঁজ নিতে। নিঘুম রাত্রি শেষে হাফিজের চোখ দুইটা
রক্ত জবা হয়ে গেছে, “কি গাে হাফিজ মিয়া, তুমি এহনও এখানে খারায়
কি করতাছাে?” হঠাৎ এমন মানুষের গলার আওয়াজ শুনে হাফিজ ঘাের
ভেঙ্গে বাস্তবে ফেরে, তাকিয়ে দেখে গ্রামের মুরব্বিয়ানা একজন লােক
মাচা হতে কিছুদূরে তার দিকেই এগিয়ে আসছে লােকটি কাছাকাছি প্রায়
চলে এসেছে মাচার। “কে বুলু চাচা নাকি?” ধীরে ধীরে মাচার সম্মুখিনে
বৃদ্ধর চেহারা স্পষ্ট হয় হাফিজের কাছে, হাফিজের প্রশ্নে একসময় বৃদ্ধ
উত্তর দিয়ে বলে “কাজ শুরু করা দরকার হাফিজ মিয়া, প্রচুর লাশ
আইবাে আইজ” নদীর ওপরে কোন মাটি দেহা যায়না শুধু রক্ত আর
লাশ দেহন যায়, আলাদা গােরখননের দরকার নাইক্যা, শুধু নদীর
কিনারে চরে বড় গর্ত করি লাশ পুঁতন লাগবাে। বইয়া থাহনের আর
কাম নাই হাফিজ মিয়া তারাতারি চল সেইদিহে যাই।”
হাফিজ কোন কথা না বাড়িয়ে একসময় মুরব্বীর পিছনে ছুটে চলে।
নদীর ঘাটে তারপর নৌকা যােগে ওপারের গ্রামে গিয়ে বিভৎস
পরিবেশের সাক্ষী হয়। চারিদিক যেন একটা গােরস্থান যারা ভাগ্যক্রমে।
বেঁচে আছে তাদের আহাজারিতে আকাশ বাতাস যেন ভারি হয়ে
উঠেছে। গ্রামের ঘরগুলাে আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে কয়লা হয়ে
গেছে। কদমতলির অনেক পরিচিত মুখের দেখা পাওয়া যাচ্ছে তারা।
স্বজনদের লাশ খুঁজতেই যেন ব্যস্ত, শােক করবার সময়টুকুও পাচ্ছে না।
নদীর তীরের কিছুটা দূরে নতুন চরে বিশাল আকার গণকবরের
কাজ সূচনা হবে। কদমতলির গ্রাম্য মাথা ফালু মাতব্বরও সেখানে
আছে, উক্ত কাজের দায় তিনি হাফিজের ওপর অর্পিত করেছেন ।
“হাফিজ মিয়া খুব দ্রুত কাজ শুরু করাে, দরকার লাগলে তােমার সাথে
আরও কয়েকজনরে নাও” বলে ফালু মাতুব্বর সকলের উদ্দেশ্যে এক
জায়গায় জমায়েতে ছােট্ট ঘােষণা দেয় “ভাই সকল, এই অসহায়।
গ্রামবাসীদের সাহায্যে আমাদের কিছু করণীয় আছে নইলে মুসলিম
হিসেবে জনম আমাদের বৃথা, তােমরা এর দায় অবহেলা করিলে
পরকালে হিসেবের সম্মুখীন হবা। সুতরাং নিজ দায়িত্বে যারা মৃত
ব্যক্তিদের কবরস্থ করণ আর যিনারা বাঁইচ্যা আছেন তাহাদিগকে আশ্রয়
ও খাবারের ব্যবস্থা করণ করা তােমাদের দায়।” উক্ত ঘােষণা শােনার।
পরে সকলেই হ্যাঁ সূচক সম্মতিতে একদল যুবক কাস্তে-কোদাল হাতে
নেমে পরে নদীর তীর নতুন চরে গণকবরের কাজে অপর আরেকটি
দলের গ্রামবাসি নির্যাতিত বেঁচে থাকা মানুষগুলাের খাদ্যের ব্যবস্থাকরণে।
কদমতলির পথে রওনা হয়।
নদীঘেঁষা নতুন চরে গণকবরের কাজ চলছে, হাফিজ মিয়াসহ
গ্রামের যুব সমাজ শেষ বিকেলের দিকে কাজ প্রায় শেষ করে এনেছে।
এখন শুধু অপেক্ষা মুদা সংগ্রহ করে এনে গণকবরে কবরস্থ করা।
হাফিজসহ কদমতলির যুবসমাজ নেমে পরেছে লাশ সগ্রহে চারিদিকে
মৃতের সংখ্যা দেখে মনে হয় গণকবরটা হয়তােবা পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে,
হাফিজ ছুটছে চারিদিক একটা মূর্দাও যেন কবরস্থ থেকে বাদ না পরে
সেই তাগিদে। গলিত লাশের গন্ধ যেন পেট হতে রক্ত মাংসে সব উগলে
বাহির করে ফেলতে চাইছে, সেইদিকেও দৃষ্টি নেই হাফিজ মিয়ার । শুধু
কোন মুর্দা যেন কবরস্থ থেকে বাদ না যায় লক্ষ্য একটাই ।
হঠাৎ এক আগুনে পােড়া বাড়ির উঠানে চোখ পড়ে হাফিজের,
দৃশ্যটা দেখে যেন মনের অজান্তে চোখে জল চলে আসে। একটি
চার/পাঁচ বছরের শিশু তার সামনে পড়ে আছে নিথর দুইটা দেহ,
বাচ্চাটি কোন কথা বলছেনা, শুধু নিস্পাপ চাহনী মাখা দৃষ্টিতে দেখছে।
নিথর দেহগুলাে। হাফিজ আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারে না এগিয়ে
যায় সেইদিকে, স্তব্ধ হয়ে কিছু সময় দাঁড়িয়ে থাকার পরে প্রথমে পুরুষ।
মৃতদেহটি কাঁধে নিয়ে বহন করে গণকবরের সামনে পৌঁছে দিয়ে হাফিজ
এবার মহিলার মুর্দাটি নিতে আসে উক্ত স্থানে এসে দেখে বাচ্চাটি
আগের মতই ঠিক একই জায়গায় নিথর হয়ে বসে আছে। এক পর্যায়ে
অতি বিনয়ের সাথে কাছে থাকা চাটাইয়ে জড়িয়ে লাশ বহনে হাফিজ
উদ্যোত হয়। কিন্তু যখনই লাশ নিয়ে সম্মুখে রওনা দেবে কোথায় যেন।
বাধা পরে পিছন থেকে। হাফিজ পিছন ঘুরে তাকিয়ে দেখে বাচ্চাটি
মহিলা মুর্দার পড়নের শরীর আঁচল টেনে ধরেছে, হাফিজ দেখতে পায়
বাচ্চাটি এবার দৃষ্টি তার দিকে ফেলেছে, প্রথমবার কথা বলে উঠে
নিপাপ মুখ “মায়রে কই লইয়্যা যান?” হাফিজ আর নিজেকে ঠিক
রাখতে পারে না, লাশটি পুনরায় ঘাড় থেকে নামিয়ে ফেলে, তারপর
বাচ্চাটিকে জড়িয়ে ধরে আহাজারি করে ওঠে। এত মুর্দার লাশ দাফনে
জীবন অতিবাহিত হলেও আজ জীবনের প্রথমবারে হাফিজের শরীর এত
ভারি হয়ে যাচ্ছে কেন? “তর মায়রে তার আপন ঠিকানায় নিয়ে
যাইতেছি বাপ দেখবি আয়।”
তারপর হাফিজ মুর্দা পুনরায় কাঁধে ছুটে চলে গণকবরের দিকে
পিছন পিছন ছুটে চলে সেই শিশু বাচ্চাটি এক সময় তারা নদী তীরের
নতুন চরের গণকবরে উপস্থিত হয়। সেখানে মানুষের জটলা কমতে শুরু
করেছে শুধু মাত্র যে গুটি কয়েক যুব সমাজ গণকবর খুঁড়ছিল তারা
দাঁড়িয়ে আছে।
মুর্দা কাঁধে দূর হতে হাফিজ মিয়াকে আসতে দেখে
তারা হাঁক ডাক শুরু করেছে “জলদি আহ হাফিজ মিয়া, তােমার জন্য
অপেক্ষা আর কোনাে মুর্দা নাই উপরে।” শেষ মুর্দাই তাহলে এইটা
হাফিজ মিয়া তাকিয়ে দেখে মূর্দায় প্রায় ভরে উঠেছে গণকবরটি।
তারপর বিনয়ের সাথে মহিলার লাশ গণকবরে রেখে উপর থেকে মাটি
ফেলানাে শুরু হয়। ধীরে ধীরে মাটি সমতলে রুপ নেয়, একটি গণকবর
রচিত হয়। দূর হইতে মেঘের গর্জন শােনা যায়, অঝাের ধারায় বৃষ্টি
নামে সাঁঝবেলায়, হাফিজসহ সকলে বৃষ্টিতে ভিজে চুপসে যায়, কাজ
শেষে সবাই মােনাজাত করে। মােনাজাত পরিচালনা করে হাফিজ নিজে,
বৃষ্টির অঝাের ধারা আর গাের খােদক হাফিজের অশু মিশে একাকার
হয়ে যায়।
অঝাের ধারায় বৃষ্টির সঙ্গে হালকা হাওয়া বয়, প্রকৃতির এইরুপ।
আচরণে গণকবরের স্থান পরিত্যাগে উদ্যোত হয় সবাই। ধীরালয়ে।
নদীর কিনারের নতুন চর শূন্য হতে থাকে।
হাফিজ মিয়া বৃষ্টিতে ভেজা চুপসানাে শরীর নিয়ে নদীর ঘাটের
দিকে রওনা হবার প্রাক্কালে হঠাৎ পিছন থেকে একটি কোমল হাত
হাফিজের হাত চেপে ধরে। হাফিজ পিছনে তাকিয়ে দেখে সেই বাচ্চা।
ছেলেটিকে, নিপাপ চাহনীতে তাকিয়ে আছে হাফিজের দিকে, হাফিজ
মৃদু হাসি মুখে টেনে বলে “বাপ যাবি আমার লগে?” বাচ্চাটি কোন কথা
বলে না শুধুই তাকিয়ে দেখে। হয়তােবা বাকশক্তি হারিয়েছে বাবামায়ের হঠাৎ মৃত্যু শােকে।
হাফিজ কথা না বাড়িয়ে ছেলেটিকে কোলে তুলে নিয়ে নদীর
ঘাটের দিকে রওনা হয়। তারপর থেকে বাচ্চা ছেলেটির স্থান হয়।
কদমতলি গােরস্থানের গাের খােদক হাফিজ উদ্দিনের চালায়।
কদমতলি গােরস্থানের গাের খােদক হাফিজের নিঃসঙ্গ জীবনে।
বাচ্চাটি অন্ধের ষষ্টি হিসেবে আবির্ভূত হয়। হাফিজ একদিন প্রশ্ন করে
“বাপ তর নাম কি?” জবাবে বাচ্চাটি কোন কথা বলে না, শুধুই তাকিয়ে
থাকে ফ্যালফ্যাল করে। হাফিজ বলে “তর নাম আইজ হইতে মতিয়ার
হােসেন অরফে মতি মিয়া। তুই পারবি আমার বাপ-দাদার চৌদ্দ
পুরুষের পেশা ধরে রাখতে।”
চান্দুশাহ
পূর্বকোণটার প্রতিটি জায়গায় শুধু কবর আর কবরে পরিপূর্ণ।
মতি জায়গা খোঁজে আর ভাবে মানুষের মৃত্যু যাত্রা কি দিন দিন বেড়েই
চলেছে। ইমাম সাহেব কে বলে আগামী জুম্মাবার মসজিদ কমিটির
একটা মিটিং ডাকা অতিব প্রয়ােজন। গােরস্থানের জায়গাটা এবার
আরেকটু বড় করতে হবে। ছােট্ট গ্রাম কদমতলির গােরস্থানটা বড় করা
প্রয়ােজন। সারাটা জীবন দুনিয়ার ঘানি টেনে শেষ যাত্রায় যদি একটু
শান্তির জায়গাই না জোটে তবে পৃথিবীতে আসার মূল্য কোথায়?
মতি জায়গা খোঁজে নতুন গােরের সন্ধানে সুনিবীড় ছায়ায়
কদমতলি গােরস্থান মতির কাছে এখন নিজ বাসস্থান, গাছ-গােছালিও
কম নয়। গােরস্থানে বলতে গেলে ছায়া শীতল ভূমি, দক্ষিণের ঠান্ডা
হাওয়াটা যখন বয় মতির মনে হয় মৃত্যুপুরীর বাসিন্দারা খারাপ নেই
তাদের নতুন ঠিকানায়। এসকল কথার মাঝে সাড়ে তিন হাত জায়গা
জোটে গােরস্থানের নতুন অতিথীর জন্য। দোয়াপাঠ যতটুকু ওস্তাদ
হাফিজ শিখিয়ে দিয়েছিল তাই বলেই মতি কোদালের কোপ মাটিতে
ফেলে।
পূর্বকোণের মাটিটা হালকা বেলে মিশ্রিত তাই গাের খোঁড়ায়
এখানে স্বচ্ছন্দটা বেশি, আবার গােরের আকৃতি ভালাে আসে। গােরের
আকৃতি ভালাে হলে মতির মনে হয় যেন মুর্দার শেষ যাত্রাটা বােধয়
ভালাে হচ্ছে। একের পর এক কোপ ফেলে মতি গাের খুঁড়ে চলে,
পূর্বকোণের কিছুটা দূরে একটা কবরে মতির হঠাৎ চোখ পড়ে।
গােরস্থানে আসার পর থেকে সে এই কবরটা দেখে আসছে। কবে কখন।
এই কবরটা হয়েছে তার হুদিসটা ওস্তাদ হাফিজ শেখও তাকে বলে ।
যেতে পারে নাই। কবরটা একটা চালার নিচে অবস্থিত কবরের ওপরে।
আবার লাল রঙের ঝালর, সেখানে নামফলকও বিদ্যমান। পড়ালেখা না
জানা মতি তার ওস্তাদ মারফতে জানতে পেরেছিল কবরের নাম ফলকে
লিখা “চান্দুশাহ বাবা নফস বন্দিয়া,” জন্ম- মৃত্যু অজ্ঞাত।
প্রতি পূর্ণিমা তিথিতে মতি দেখেছে সেখানে ওরস হয়, নানান
কিসিমের মানুষের সমাগম ঘটে, গ্রামের মানুষ অনেকে বিশ্বাস নিয়ে।
সেখানে ভক্তি করে আবার অনেকে আছে এগুলাে বেদ-আত কাজ বলে।
সেখানে ভেড়ে না। দূরদূরান্তের মানুষগুলাের মাঝে সেখানে মাথায়
জটালা কিংভূতকিমাকার মানুষেরাও আগমন হয় প্রতি পূর্ণিমা তিথিতে,
তবে এই কবর ও কবরের বাসিন্দাকে নিয়ে মতবিরােধ গ্রামের মানুষের
মাঝে বিদ্যমান থাকলেও মতির একটা দিন কিন্তু ভালােই লাগে আর তা
হলাে প্রতি ওরসে খিচুরী পাক হয়। চান্দুশাহ বাবার ভক্তবৃন্দরা চাল,
ডাল, মুরগী, যদি ভাগ্য ভালাে হয় তবে খাসীও জোটে এগুলাে দিয়ে
অমৃত স্বাদের খিচুরীপাক করে। মতির তিনদিন যাবৎ আহারের ব্যাবস্থা।
এই খিচুরী থেকেই হয়ে যায়। কিংভূত কিমাকার মানুষের মাঝে আবার।
গায়ক কিসিমের অনেকেই থাকে। যারা গানের আসর জমায়, মােমবাতি
প্রজ্বলনসহ আতর গােলাপ ছিটানাে কোনটাই বাদ রাখে না বাবা
চান্দুশাহের ভক্তকুল।
৩
বর্তমানে অত্র কদমতলি গ্রামে এই কবর দেখাশােনার জন্য।
একজন খাদেম নিযুক্ত আছে। যাহার নাম নজু মন্ডল, প্রতিনিয়ত
বৃহস্পতি দিনগত রাতে তার গােরস্থানে আগমন ঘটে, মতির সাথে বেশ।
কিছুদিন আলাপও হয়েছে তার। একদিন নজু মন্ডল বলে “বুঝলা মতি,
বাবা চান্দুশাহ কিন্তু খুবই জাগ্রত, বৃহস্পতি রাতে তার পবিত্র আত্মা।
আরও বেশি জাগ্রত থাহে,সূদুর ইয়ামেনের বাসিন্দা বাবা চান্দুশাহ এই
গ্রামে অনেক বিপদ আপদ সে একলাই সামাল দেয়।” মতি শুনে হঠাৎ
হকচকিয়ে যায়, মৃত মানুষে ক্যামনে বিপদ সামাল দেয়!! সে ভাবে নজু
মুণ্ডলের কথা কিন্তু কোন সূরাহা করতে পারে না। নজু মন্ডল বলেই চলে।
মতি তুমি কিন্তু বাবার অসম্মান করতাছাে নিয়মিত মাজার প্রাঙ্গন ঝাড়
দিতেছনা, আবার আগরবাতিও জ্বালাও না দেহি। বাবাই কিন্তু বেজায়
গরম মাল, রাইত-বিরাতে কবরস্থান পাহাড়া দাও তাই তােমারে সতর্ক
করি, কোনদিন ক্ষতির সম্মুখীন হবা সেইদিন আমার কথা টেইর
পাইবা"।
নজু মন্ডলের বাড়ি কদমতলীর পাশের গ্রাম রসূলপুর । লােক
মারফতে জানা যায় সে কোন কাজকর্ম না করলেও বাড়িতে তার কোন
কিছুরই অভাব নাই। চান্দুশাহ বাবার মুরিদরা অত্রাঞ্চলে আসলে প্রথমে
নজু মন্ডলের বাড়িতে ওঠে। আরও লােকশ্রুতিতে জানা যায় নজু মন্ডল
নাকি চান্দুশাহ বাবার বংশীয় আওলাদ তার কাছে আসলে চান্দুশাহ
বাবার দেখা মেলে। নজু মন্ডলও প্রতিটা মানুষের সম্মান আত্তি গ্রহণ
করে সূরাহা দেয়, বেশির ভাগ তার একই রকম, “জোড়া মােরগ মাজার
স্থানে উৎসর্গ করবা, আধামুন চাউল দিবা, যদি সম্ভব হয় দুধ দিয়া
একটা ফিরনী ব্যবস্থা করবা কারণ চান্দুশাহ বাবার পছন্দের জিনিস
হইলাে দুধ।” মােরগগুলাে বেশিরভাগ নজু মন্ডলের বাসায় যায়, আর
আধা মণের ডাল-চালের পাকানাে খিচুরীর অর্ধেকটাই নজুমন্ডলের
বাড়িতে যায়। যা অর্ধেক থাকে তা বন্টন হয়।
কবরের চালা ঘরের চার খুঁটির একটায় দানবাক্স বাঁধা অনেকে।
আবার নজু মন্ডলের কথায় সেখানে পয়সা ফেলে। সপ্তাহ অন্তরও নজু
মন্ডল বাক্স নিয়ে যায়। আবার সেটা পরদিন এসে ঝুলিয়ে দেয়, মাস
ছয়েক হল কবরটার চারিদিকে বাঁশের ঘের দেওয়া হয়েছে, মাজার
উন্নয়নের মধ্যে এই একটা উন্নয়ন তবে মজার ব্যাপার সচরাচর দেখা
যায় অনেক গ্রামের সম্ভ্রান্ত পরিবার এই মাজার মুখি হচ্ছে যা নজু
মন্ডলের জন্য অনেক সুখের ব্যপার, নজু মন্ডলের মুখ ভর্তি দাড়ি মাঝে
সুরমাযুক্ত চোখ তাই আজ বেশিই চকচকে দেখায়। তার শরীরে ব্যবহৃত
সুগন্ধি আতরের দামটা নিশ্চয়ই দিনকে দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে।
দিন দিন বেড়েই চলছে ভক্তের সংখ্যা, সাথে বাড়ছে মাজার স্থানে।
বিভিন্ন মানুষের আনাগােনা, এর মাঝে কিছু সংখ্যক আছে সন্তানহীনা
নারীসমাজ যারা প্রতিনিয়ত জোড়া মােরগ রেখে চলে যায়। কোনদিন
নজু মন্ডল সেগুলাে ধরে নিয়ে যায়, আবার কিছু সংখ্যক রাতের নিশাচর
প্রাণি কুলের আহারে রূপান্তরিত, কিছুকাল হল লাল রঙের চাঁদ তারা।
খচিত নিশান মাজার চালায় উড়ানাে হচ্ছে, নজু মন্ডলের কথা “এই
নিশান যতদূর পর্যন্ত দেহন যাইতাে ততদূর পর্যন্ত আপদ বালাই থাকতাে
না।”
প্রতি বৃহস্পতি রাত নামলেই মাজার প্রাঙ্গনে কিছুদিন যাবৎ
একাধিক লােকের আনাগােনা শুরু হয়েছে সেখানে বয়ান শােনায় নজু
মন্ডল, কবরের বাসিন্দার কোন উন্নয়ন নেই কিন্তু খাদেম ফুলে-ফেঁপে।
ওঠে। জোহরের ওয়াক্তের সম্মুখীনে, মতির গাের খােড়া প্রায় শেষ
পর্যায়ে আকৃতি প্রদান চলছে। আকৃতি প্রদান ভালাে না হলে মুর্দার।
ওয়ারিশরা চরম গরম দেখায়, সব গরম এসে পরে মতির ঘাড়ে, তাই
মতি সুনিপুণ হাতে গােরের আকৃতি দিতে ব্যস্ত, কবরের খাঁড়ালের
ব্যবস্থাটা মুর্দাবাড়ি হতেই বেশিরভাগ সময় হয়ে থাকে তাই সে দিকটা
নিশ্চিন্ত।
“কইগাে মতি কি অবস্থা,” তােমার কতদূর, দূর হতে হাঁক শােনা
যায়। দূরপানে মতি চেয়ে দেখে মুর্দাবাহি মানুষের ঢল। মাঠ-ঘাট
পেরিয়ে তারা আসছে শেষ যাত্রায় সঙ্গি হয়ে। এইতাে কিছুসময়
এতটুকুই শেষে কবরস্থ করে তারা চলে যাবে। তারপর হয়তাে আর
কোন খোঁজই নেবেনা, মৃত্যুপুরীর বাসিন্দার একাকিত্বের সময় সূচনা
হবে। এই ধারাই তাে চলছে পৃথিবীর সৃষ্টিকাল হতে, কোন কোন সময়
কিছু মুর্দার দেখা মেলে মতির যারা কিনা ঠিকানাহীন।
ওস্তাদ হাফিজ বলে গিয়েছেন মতিকে এদেরকে নাকি বেওয়ারিশ
মুর্দা বলা হয়, কদমতলি গােরস্থানের দক্ষিণ দিকটায় বেওয়ারিশদের
জায়গা নির্ধারণ করা, আবার অপঘাতে যারা মারা যায় তাদেরও সেখানে
দাফন করা হয়।
অবহেলা অনাদরে সেদিকটা জংগলে আজ পরিপূর্ণ, পূর্বকোটায়
চান্দুশাহ বাবা নফস বন্দিয়ার কবরে জলে মােমবাতি দক্ষিণকোণে থাকে
ঘাের অন্ধকার, পৃথিবীর উপরিভাগের মানুষের বৈষম্যের শিকার হওয়া
কবরগুলাের বাসিন্দারা কিন্তু মৃত্তিকার মাঝে একই জগতের বাসিন্দা
তাদের নেই কোন ভেদাভেদ, মুর্দাবাহি লােকের সমাগম গােরস্থানে
প্রবেশ শুরু করেছে আর স্বল্প সময়ের মাঝে মৃত্যুপুরীতে নতুন অতিথীর
আগমন ঘটবে। পুরনাে যারা আছে তারা নিশ্চয় দেখছে একজন মৃতের
শেষযাত্রা আর বলছে এসাে হে নবীন তােমার কর্মফলই হবে তােমার
শেষ দিনের ভরসা। সবাই আসবে একদিন এই পুরীতে কেওবা আগে
আবার কেউ পরে।।
নদী।
চির সবুজ ঘেরা কদমতলি গােরস্থানের দক্ষিণ দিকে বয়ে চলা
ছােট্ট নদী, নদীকে ঘিরে কদমতলির মানুষের অনেক ভরসা, গ্রাম্য
জীবনের জীবিকা প্রবাহ নির্ভর করে নদীর ওপরে, ছােট্ট বয়ে চলা।
স্রোতসিনীর সঠিক নির্দিষ্ট কোন নাম নেই। বরাবরই নদীটি শান্ত
সুশীতল, নদীর বুকে চলে ছােট খেয়া যারা কিনা পারাপারে ব্যস্ত থাকে
কখনও মাছ শিকার করে, মাঝে মধ্যে নদীতে বড় পানসীর আগমন ঘটে
দূরদূরান্ত থেকে। বিয়ে বাড়িতে যাতায়াত চলে ময়ূরপঙ্খি নিয়ে, নদীর
দুই ধার ঘেঁষে ওঠা জীবনগুলাে দিনের সিংহ ভাগ চাহিদা মেটায় নদীকে
ঘিরে।
কদমতলি গােরস্থান নদী হতে উত্তরে উঁচু টিলার মত স্থানে মাথা
তুলে তার অবস্থান বরাবরই জানান দেয়। গন্ডগােলের বছর দুয়েক পর।
অনেক বর্ষা হয়েছিল সেইবার এই শান্ত নদী অশান্ত হয়ে
উঠেছিল।
দুধার
ভেঙ্গে নদীর প্রশস্ততা এতটাই বেড়েছিল সে পানি এসে গােরস্থান ছুঁইছুই
করছিল। সেই বছরেই নতুন চর নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে আর
কখনও মাথা তুলে দাঁড়ায় নাই। চরের সঙ্গে গণকবরের চিহ্নটাও তাই
আজ নদীগর্ভে বিলীন।
গােরস্থানের মাচায় বসে হাফিজ আর মতি মিয়া বিশ্রাম করছে।
বয়সের ভারে হাফিজ অনেকটাই নুয়ে পড়েছে সাগরেদ মতি মিয়া তখন।
কৈশরের শেষ বেলায় অবস্থান করছে, হঠাৎ হাফিজ মতিকে ডেকে বলে।
“মতিয়ার সকালে যে মুর্দার গাের খননের আইছিলাে সেইটার কি
অবস্থা?” উত্তরে মতি মিয়া বলে “উস্তাদ তােমার মতি থাকতে এগুলাে
নিয়া ভবনের কাম নাই তুমি নিশ্চিন্তে বিশ্রাম করাে” মতির কথা শুনে।
হাফিজের চোখ ভরসায় জ্বলজ্বল করে ওঠে, সাগরেদের এমন জবাবে।
ওস্তাদ হাফিজ উদ্দিনের মন অনেক প্রশান্ত হয়।
“বুঝলিরে মতি শরীরের অবস্থাটা ভালাে না কখন কি হয়, আমি
থাকলে তুই থাকবি এই কদমতলী গােরস্থানে আমার শেখানাে
বিদ্যার সবগুলি তরে শিখাইয়া গেলাম। কখনও মানুষের কাছে গাের
খননের লাগি পয়সা নিবি না, রিযিকের মালিক আল্লাহপাক দেখবি ঠিক
উনি তাের রিযিকের ব্যবস্থা করে দিবেন” জবাবে মতি কোন উত্তর দেয়
শুধু শ্ৰদ্ধাচিত্তে ওস্তাদের মুখের কথা শােনে, হঠাৎ হাফিজ কাশি দিয়ে
ওঠে, কাশিতে ভয়ংকর শব্দ বাহির হয়। মতি পানির পাত্রে কলস থেকে
পানি ঢেলে ওস্তাদের মুখে ধরে, হাফিজ তৃপ্তি সহকারে তৃষ্ণা মেটায়।
তারপর।
শ্বাস টেনে বলে, “বুঝলিরে মতি আমার সময় অনেকটাই
সন্নিকটে চইলা আইছে, ওপারের ডাক শুনতে পাই” মতি মিয়া।
হাফিজের কপালে হাত রেখে দেখে শরীর উত্তপ্ত, “তুমি অহন বিশ্রাম
নিবা ওস্তাদ, বেশি কথা কওনের কাম নাই, আমি নতুন গােরের কাজ
শেষ কইরা আহি" এই কথা বলে কোদালখানা ঘাড়ে নিয়ে নতুন গােরের
দিকে রওনা হয় মতি মিয়া।
বাদ যােহর ওয়াক্তে নতুন মুর্দা দাফন শেষ করে মতিয়ার চালায়।
ফিরে দেখে ওস্তাদ হাফিজ তখনও চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে, জায়গীর।
বাড়ি হতে দুপুরের খাবার দিয়ে গেছে, হঠাৎ পায়ের আওয়াজে হাফিজ
আড়মােরা ভেঙ্গে বলে মতিয়ার আইছােস? তুই খাবার খাইয়্যা বাসন।
নদীতে ধুইয়া রাখবি বাজান” জবাবে মতি মিয়া বলে “তুমি খাইবানা।
ওস্তাদ?” হাফিজ বলে “না রে বাজান শরীর ভালাে যায় না কিছু
খাইতে ইচ্ছা করেনা তুই খাইয়া আয়, তাের সাথে দুইডা গপ্পো করি।
তাইলেই শান্তি পামু।
মতিয়ার দুপুরের খাবার খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তােলে। তারপর
নদীতে জায়গীর বাড়ির থালা-বাসন পরিষ্কার করে এসে অসুস্থ ওম্রাদের
মাথার পাশে বসে বলে “উস্তাদ তুমি মাঝে মধ্যেই আইজকাল মরণের।
গপ্পো হুনাও, তুমি না থাহনে আমার কি হইবাে একবারও ভাবছােনি,
এই দুনিয়ায় তুমি ছাড়া আমার কে আছে কও?” জবাবে হাফিজ উদ্দিন।
শেখ হেসে বলে “আরে পাগল এই দুনিয়ায় সারা জীবন কেউ বাঁচার
লাগি আসে না, বাঁচার লাগি যদি আইতাে তাইলে কি আর কদমতলি
গােরস্থান হইতাে, আর তুই আমিও গােরখােদক হইতাম না” কথাটি
শেষ করে হাফিজ অট্টো হাসিতে মাতে যে হাসির মাঝে নাই কোন সুখ
আর না আছে কোন দুঃখ। হাসির মাঝে আবার কাশিও আছে, কফের
সঙ্গে এখন মাঝে মাঝে রক্ত আসে “থাউক তুমার অহন কথা কওনের।
কাম নাই তুমি জিরাও অহন আমি গিয়া নতুন গােরের বেঁড় বাইন্দা।
আহি।” মতির এমন অভিমানে হাফিজের প্রশান্তি আসে পৃথিবীতে কিছু
অভিমান সত্যিই মানুষকে অনেক প্রশান্তি দেয়। হাফিজ বলে “বাজান।
এইনা আইলি অহন একটু বস আমার পাশে তর সাথে কিছু গফ আছে,
যেগুলাে তরে শুনন দরকার আছে" জবাবে মতি মিয়া বলে “তােমার

Post a Comment
0 Comments