রমিজ মিয়া | আসাদুজ্জামান আসাদ
পাহাড়িরাও মানুষ, সরল মানুষ।
ওরা রমিজ মিয়ার কাছ থেকে শিক্ষা
নিয়ে দুনিয়াকে দেখাতে চায়।
আলাের নাচন। তারা চায় না।
অস্ত্রবাজ ও চোরাকারবারিরা ওদের
পাহাড়ে থাকুক।
বলা হয়েছে নয়ন শাহ'র মতাে।
সাহসী সন্তানের কথা। সমতলের
টাকা লােভী মানুষের পরাজয়।
দেখানাে হয়েছে। সুদ সামাজিক
ব্যাধি তা থেকে দূরে থাকতে
বলেছেন রমিজ মিয়া।
রমিজ মিয়ার মন ভালাে নেই । বছরের অন্যসব দিনের মতাে
নির্জন নয় আজ রমিজ মিয়ার বসতভিটা। রমিজ মিয়ার বাড়ির
দুই পাশে পাহাড়। মাঝখানে বাঁশ ও বেত দিয়ে পাটাতন করা
তিনটি ঘরের বসতভিটায় বসত করে রমিজ মিয়া। পাহাড়ি রাস্তা
পেরিয়ে গিরিপথের কিনার ঘেঁষে রমিজ মিয়ার দরবার শরীফ।
জন্মসূত্রে রমিজ মিয়া পাহাড়ি মানুষ নয়। তাঁর বাপদাদার ভিটা
বাংলাদেশের ভিন জেলায়। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান রমিজ
ঘনবসতিপূর্ণ শহর ছেড়ে পাহাড়ি মানুষ সেজেছেন পাহাড়কে
ভালােবেসে। জীবনে অনেক দেখেছেন
তিনি। শৈশবের চঞ্চলতাপূর্ণ দিনগুলাে
থেকে শুরু করে শেষ দিন পর্যন্ত যেদিন
তিনি লােকালয় ছেড়ে ছিলেন তার
আগের একটা স্মৃতিও ভােলেন নি।
রমিজ মিয়া জীবনকে উপলব্ধি
করেছেন জীবনের মতােই। শৈশবের
সরলতা রমিজ মিয়াকে যেমন ঠকায়নি
এক মুহূর্তেও; তেমনি কৈশাের-যৌবনও। তবুও রমিজ মিয়া
নিজ জেলা ছেড়ে আজ পাহাড়ি মানুষ। পাহাড়ি এলাকার ভিন্ন
নীতি দেখেছেন। দেখেছেন ভিন্ন কৃষ্টি।
সব কিছু দেখে তাঁর মনে হয়েছে পাহাড়ের আশেপাশের
মানুষ হওয়াই উচিত তার। নির্জনে থেকে নিজেকে সময় দিয়ে,
নিজের চেতনাকে জাগ্রত করে একজন বড় মনের, বড় চিন্তার
মানুষ হতেই দুই পাহাড়ের সমতলে রমিজ। এখানে থেকে
রমিজ পাহাড়ি ছেলেমেয়েদের শিক্ষিত করার কাজে দিনের
বেশিরভাগ সময় কাটান। পাহাড়ি স্কুলের বার্ষিক সাংস্কৃতিক
অনুষ্ঠান আজ। আশেপাশের এলাকার মানুষজন আজ রমিজের
বসতভিটায়। পাহাড়ি মানুষরা কেউ কেউ একা, আবার কেউ
কেউ সপরিবারে চলে এসেছে অনুষ্ঠানে অংশ নিতে।
স্কুলের নাম নাসিদং। এই স্কুলের ৩ জন শিক্ষকের মধ্যে
রমিজ প্রধান। স্কুলে ২১ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৭ জন শিক্ষার্থী
আজ পারফরম করবে। অতঃপর ওরা স্কুল ছেড়ে সংসার জীবনে
যাবে। তাদের পড়াশােনার পাঠ শেষ।
নাসিদং স্কুলের পড়াশােনার পাঠ পরিকল্পনা অন্যসব স্কুলের
মতাে না। এখানে কোনাে শ্রেণিভেদ নেই। আছে শুধু শিক্ষার
স্তর। এই স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের বই পড়তে হয় না। ওরা শিক্ষা
গ্রহণ করে প্রকৃতি থেকে। ওদের শেখানাে হয় কেমন করে
জীবনকে সুন্দরভাবে চালিয়ে নেয়া যাবে। পাহাড়ি মানুষের
অধিকার রক্ষা করা যাবে। স্কুলের শিক্ষা শেষে এই স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা দরবারের সদস্য পদে নাম লিখান। তারা এই দরবারের
বার্ষিক জলসায় অংশগ্রহণ করে নবশক্তি নিয়ে ঘুরে ফেরে।
এক সময় পাহাড়ে ভিন্ন ধরনের পাখ-পাখালির আবাস
ছিল। ছিল ভিন্ন জীবজন্তু। এখন আর আগের মতাে নেই।
পাহাড়িরা সব কিছুই খেয়ে সাবাড় করে ফেলেছে। এক সময়
পাহাড়ে জুম চাষ হতাে।এখন হয় না। কিছু কিছু এলাকায়
চাষাবাদের কোনাে ব্যবস্থা নেই। নেই কোনাে উৎপাদন।
দরবার শরীফের সদস্যদের দরবার থেকে যে চেতনা
দেওয়া হয় তা হলাে জীবনকে চালিয়ে নিতে উৎপাদন করতে
হবে। প্রভুর প্রতি আনুগত্য স্বীকার করতে হবে। তার সন্তুষ্টির
জন্য নিজেকে সমর্পণ করতে হবে। পাহাড়ি মানুষদের ধর্মীয়
কৃষ্টি ব্যতিক্রম। এখানে জাত ও ধর্মের ভিন্নতা থাকলেও
মানুষের ভেদাভেদ নেই। মানুষগুলাে শান্তিপ্রিয়। পরম্পর
সুসম্পর্ক বজায় রেখে জীবনধারণ করে। এখানে কিছুকিছু
অঞ্চলের পাহাড়ি সন্তানরা শহুরে জীবনের সন্ধান পেয়েছে।
রমিজ পাহাড়ি সন্তানদের শহরে যেতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। পাহাড়ি
মানুষদের অসুখবিসুখ হলে দেখার কেউ নেই। ডাক্তার-কবিরাজ।
নেই। অন্য জেলা থেকে কয়েকটি এনজিও এসে স্বেচ্ছায়
দু'একবার সামান্য ওষুধ দিয়ে যায়, যা দিয়ে সারা বছর চলে ।
এইতাে গত মাসের কথা। রমিজ পাহাড়ি পথ ধরে
হাঁটছিলেন। এমন সময় তার চোখে পড়ল কয়েকজন পাহাড়ি
খুব দ্রুত বেগে হাঁটছে। তাদের একজনের কাঁধে একধরনের
বস্তা দিয়ে পেঁচানাে একটি শিশু। রমিজ পাহাড়ি যাত্রীদের কাছে
জানতে পারলেন, কাঁধে থাকা বস্তায় পেঁচানাে শিশুটি অসুস্থ।
তাকে শহরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে চিকিৎসার জন্য।
রমিজ মিয়া শিশুটির গায়ে হাত দিলেন। অনুভব করলেন
শিশুর গায়ে অনেক উত্তাপ। গরমে সমস্ত শরীর লাল হয়ে গেছে।
গা থেকে ঘাম ঝরছে। রমিজ মিয়া শিশুটিকে তখনই নিচে
নামিয়ে গামছা পানিতে ভিজিয়ে শিশুর সারা শরীর বার বার মুছে।
দিয়ে শিশুর মা-বাবাকে সান্তনা দিয়ে বুঝাতে চেষ্টা করলেন এই
শিশুটি জ্বরে ভুগছে। একজন জ্বরের রােগীকে বস্তা পেঁচিয়ে ওরা
ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাচ্ছে। এটি এক অবাক করা ব্যাপার
হলেও এর বাইরে কোনাে উপায় জানা ছিল না ওদের।
রমিজ মিয়া বাড়িতে নিয়ে গেলাে ওদের। তাঁর ঘরে থাকা
প্যারাসিটামল ট্যাবলেটের অর্ধেক পানির সঙ্গে মিশিয়ে শিশুটিকে
খাওয়ানাে হলাে। সঙ্গে থাকা মানুষদের বলা হলাে শিশুর গা
বারবার মুছে দেওয়ার জন্য। কিছুক্ষণের মধ্যে শিশুর গায়ের
উত্তাপ কমতে থাকল। শিশুটি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এল।
অবস্থার উন্নতি দেখে ওর মা-বাবা আবেগ ধরে রাখতে পারল
। ওরা চিল্কার করে কেঁদে উঠল। রমিজকে জড়িয়ে ধরে ওরা
এমন ভাব করল যেন নতুন জীবন ফিরে পেয়েছে শিশুটি।
তখন শিশুর নাম জানতে চাইলাে রমিজ। মা এগিয়ে এসে
জানাল ওর নাম বাইকিং মারমা । ওর জন্ম হয়েছিল এক পূর্ণিমার
রাতে। জন্মের দিন এই ছেলের বাপ পাহাড়ি অঞ্চলে ছিল না।
তিনি ছুটে গিয়েছিলেন তল্লায় বল্লম বানাতে। এ কাজ করতে
গিয়ে সাত দিন, সাত রাত হাঁটতে হয়েছে বাইকিং- এর বাবার।
রমিজ বাইকিং-এর বাবার কাছে জানতে চাইল এখন কী
করবে ওরা ? ভিনজেলায় যাবে, নাকি বাড়িতে ফিরবে ।
বাইকিং-এর বাবা জানাল ওরা আর ওদের পাড়ায় ফিরতে চায়
। ওরা রমিজের অঞ্চলেই বসত করতে চায়। এ গাঁয়ে থেকে
রমিজের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে জীবনকে নতুনভাবে সাজাতে
চায়। বাইকিং-এর বাবার আবেগ দেখে রমিজও তাদের
নিরুৎসাহিত করে নি। বসতভিটার পশ্চিমের ঘরটি বাইকিংয়ের
নামে বরাদ্দ করে দিয়ে দিলেন রমিজ।
মন ভালাে না থাকার দিনগুলােতে এখন বাইকিংকে নিয়ে বের
হয়ে পড়েন রমিজ। পাহাড়ের চূড়ায় বসে ধ্যানমগ্ন সময়
কাটান। কিন্তু আজ আর তেমন ইচ্ছে হচ্ছে না। মন খারাপ
নিয়ে রমিজ উৎসবে থাকছেন। উৎসবে যে সাতজন বিদায়
নিবেন তাদের দীক্ষা দিবেন। তারা সংসারী হওয়ার আগে এ
অঞ্চলের নিয়মানুযায়ী শিকারে বের হবে। যে কোনাে পাহাড়ি
জন্তু শিকার করে দরবারে হাজির শেষে ওদের অঞ্চল নির্ধারণ
করা হবে।
সাতজনের সবচেয়ে ছােটজনের নাম বার্মিজ বেগ। রমিজ
বার্মিজ বেগের ঠিক সামনে যােগাসন করে বসা। বার্মিজ বেগ
দুই পায়ের হাঁটুর উপর ভর করে রমিজের মুখােমুখি বসে
আছে। রমিজ গৌরবর্ণের মানুষ। দেখতে সাধু বাবার মতাে মনে
হয়। তাদের মাথায় পাগড়ি থাকে, কিন্তু রমিজের মাথায় পাগড়ি
নেই। বার্মিজ রমিজের সামনে বসতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে
করছে। শঙ্কাহীন ভাব নিয়ে মাথা উঁচু করে বসা বার্মিজ। সে
পাহাড়ি মানুষ। শৈশব থেকে পাহাড়ি জীব-জানােয়ারের সঙ্গে
তার বসত । তাকে দীক্ষা দিবেন রমিজ। শুরু হলাে দীক্ষা পর্ব
এখন রমিজের বিষন্নতা কেটে গেছে। তিনি খুব আত্মবিশ্বাসী।
বার্মিজকে দীক্ষা দেওয়া শুরু করলেন। ওকে দুচোখ বন্ধ করতে
বললেন। সারা বাড়িতে খুব উৎসব উৎসব ভাব। সবাই খুব শান্ত
হয়ে বাড়ির উঠানে যার যার মতাে কেউ দাড়িয়ে, কেউ বসে।
আছে।
বার্মিজ চোখ বন্ধ অবস্থায় চিৎকার করে বলে উঠল ‘বন।
হে আমার গুরু ! আমায় হুকুম করুন। কোন পরীক্ষায় আমাকে
আমি সমর্পণ করব ?
রমিজ দু’চোখ বােজা বার্মিজকে কোনাে আদেশ না দিয়ে
তার সামনে সাতজনের সবচেয়ে বড় জনকে হাজির করে
বার্মিজকে জিজ্ঞেস করলেন; বলাে বার্মিজ তােমার সামনে
তােমাদের সাতজনের যে একজন দাঁড়িয়ে আছে তার নাম কী ?
বার্মিজ বলল, ওর নাম শর্সা মরমা। এতক্ষণ চারদিক নীরব
ছিল। হঠাৎ সেই নিরবতা ভেঙে সবাই বলাবলি করতে শুরু
করল যে বার্মিজ সঠিক শিক্ষা পেয়েছে। যােগ্য গুরুর যােগ্য
শিষ্য সে।
একে একে সাতজন এখন রমিজের সামনে দাঁড়ানাে।
রমিজ যােগাসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন। একের পর এক
সবাইকে বুকে জড়িয়ে তাদের হাতে সাতটি পাথর তুলে
দিলেন। আর বললেন, এই পাথরের কারুকাজে আমার আদেশ
লুকিয়ে আছে। তােমরা নির্দেশ মতাে পাথরে খােদাই করা জন্তু
আগামী সাতদিনে দরবারে হাজির করবে। তােমরা চাইলে
এখনি বেরিয়ে পড়তে পারাে। তােমরা মুক্ত। মনে রেখ
তােমাদের হাতে মাত্র সাতদিন সময়। এর মধ্যে যদি তােমরা
কেউ ব্যর্থ হও সে আমার শিষ্যত্ব হারাবে।
তাদের গুরুভক্তি শিখিয়েছে নাসিদং স্কুল। মুক্ত মনের
মানুষ হতে পথ দেখিয়েছে। এখন ওদের সামনে সুন্দর একটি
স্বপ্ন যা দেখে পাহাড়ি জনপদ, যা দেখে ওদের মা-বাবা। আর
সেই স্বপ্ন হতাে- ওদের সন্তানরা ওদের ছাড়িয়ে যাবে। ওরা
বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করবে।
রমিজ মিয়ার সাত শিষ্যরা কালা পাহাড়ে অস্ত্রের সন্ধান পেয়ে
আঁতকে উঠল। তাদের ধারণা এ অঞ্চলেই সেই আস্তানা।
যেখানে দুষ্কৃতিকারীদের বসত। তারা কালা পাহাড়ে একরাত
অবস্থান করবে বলে সিদ্ধান্ত নিল ।
শর্সা মরমা যেহেতু দলের মধ্যে সবার বড়, তাই তার উপর
অন্য ছয় জন সদস্যই আস্থা রাখল এবং শিকারে সবাই একত্রে
বের হলাে।
‘হাতে মাত্র সাতদিন সময়। এর মধ্যে শিকার খুঁজতে
হবে। সবার উদ্দেশে বলল বার্মিজ।
বােধােদয় হওয়ার পর থেকে বার্মিজ শুনে আসছে এখানকার
জীবনচিত্রে বহিরাগত দৃষ্কৃতিকারীরা অস্থিরতা এনেছে।
পাহাড়িদের জীবন এমনিতেই সাদামাটা। কিছু পাড়ায় পাড়া
প্রধানরা যুবকদের নিয়ে সবসময় সজাগ থাকেন। যেন তাদের
অঞ্চল দিয়ে কনাে পাচারকারীর অনুপ্রবেশ না ঘটে। সাদামনের
মানুষদের চেতনায় কখনাে লােভ, ক্ষোভ থাকে না। প্রাপ্তিঅপ্রাপ্তির ধারে কাছে নেই তারা। তারা বােঝে দিনভর পরিশ্রম
করতে হবে। তারপর গল্প, আডডায় রাতে মেতে থাকা যাবে।
ওদের মধ্যে চারজন রাতে থাকার আয়ােজন করতে লাগল ।
যেহেতু শীতের রাত, তাই রাতে মিশন নিয়ে কালাপাহাড়েই
থাকবে। এখানে কোনােভাবেই আগুন জ্বালানাে যাবে না। যে
বিছানায় থাকবে সেখানে করকর, মরমর শব্দ করা যাবে না।
তিন জন খাবার সংগ্রহে বের হয়েছে। ওরা পাহাড়ি এলাকার
যে অংশে এসে পৌঁছেছে, এখানটায় কোনাে জনবসতি
নেই। ওরা
আছে কুমারি পাহাড়ের
একাংশে। এ পাহাড়ের কিনার বেয়ে একটি
লেক। আশপাশের অঞ্চলের পাহাড়ি ঝর্ণার
পানি লেক দিয়ে স্রোতের মতাে প্রবাহিত
হচ্ছে। এ স্রোত একমুখী। নদী বা সমুদ্রে
যেমন জোয়ার-ভাটা থাকে, এ লেকে তেমন
জোয়ার-ভাটা থাকে না।
বার্মিজ বাকি দু'জনকে ডাকল। সে একটি অজগর সাপের।
সন্ধান পেয়েছে। যে করেই হােক এই সাপটিকে ধরতে হবে। এ
সাপটি দিয়ে শুধু আজ কেন, আগামী ছয় দিনের আহারের ব্যবস্থা
হবে। সাপটি মানুষের উপস্থিতি টের পেয়েছে, তাই দ্রুত গতিতে
পালাতে চাইছে। বার্মিজ দৌড়ে গিয়ে সাপের লেজ ধরে টানতেই
সাপটি আরও বেগবান হয়ে সামনে ছুটল। বাকি দুজন সাপের
উপর চড়াও হয়ে সাপটিকে ধরে স্থির করার চেষ্টা করছে।
পাহাড়ি অজগর। এটি অনেক শক্তিধর। এ সাপের বিষ
থাকে না। তবে ধারালাে দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরতে পারে। আস্ত
মানুষ কিংবা গরু-ছাগল গিলে পেটে পুরতে পারে এ অজগর।
ওদের পেট পুকুরের মতাে বড় হয়। এর লেজে এক ধরনের
এসিড থাকে। যতবড় পশু কিংবা মানুষই সে পেটে ভরুক না।
কেন, তা কিছু সময়ের মধ্যে হজম হয়ে যায়।
বার্মিজরা অজগরটাকে আয়ত্তে আনতে পেরেছে। এটার
নড়াচড়া বন্ধ হয়েছে। অজগর বেচারা এতক্ষণে হয়তাে বুঝতে
পেরেছে যে, তার সমস্ত চেষ্টাই বৃথা হয়েছে। আস্ত অজগরের
লেজ ধরেছে বার্মিজ। মাথা ধরেছে পাভুজ আর কোমর ধরেছে
মানুজ। পান্ডুজ আর মানুজ একই পাহাড়ের। একই পাড়ার
মানুষ। পান্ডুজ গ্রাম প্রধানের সন্তান। অজগরের কোমরের
পেশির মাংস ওর খুব প্রিয়।
শক্তিশালী পাহাড়ি যুবকরা মস্ত অজগর কাধে করে
কালাপাহাড়ের শীর্ষে ছুটছে। শর্সা মরমারা ইতিমধ্যে থাকার
জায়গা বেছে নিয়েছে। ওরা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কালাপাহাড়ের
আশপাশের ঝােপে ঘাপটি মেরে থাকবে। বন্দুক তথা অস্ত্রটি
যদি কেউ রেখেই গিয়ে থাকে তবে সে নিশ্চয় আসবে।
অস্ত্রটি
দেখে ওরা বুঝতে পেরেছে এটা নিশ্চয়ই দুষ্কৃতিকারীদের ।
রাত গভীর হওয়ার আগেই খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপার সেরে
ফেলতে হবে। পেটের ক্ষুধা নিয়ে ওরা মিশনে থাকতে চায় না।
পাহাড়ি মানুষ নিয়মের বাইরের মানুষ। বাংলাদেশের অন্য
এলাকার মানুষদের সঙ্গে ওদের জীবনযাত্রার মানে বিশাল
ফারাক।
মানুষ দুনিয়ায় একা আসে আবার একাই বিদায় নেয়। সে
যে পরিবেশে জন্ম নেয়, সেই পরিবেশই মানুষের চরিত্রের সঙ্গে
মিশে যায়। একজন মানুষ হিন্দুর ঘরে জন্ম নিয়ে হিন্দু ধর্মে
জীবন পার করে। একজন মানুষ সাঁওতাল হয়ে জন্ম নিয়ে
সাঁওতালি জীবন বেছে নেয়।
পাহাড়ি সন্তানরা পাহাড়ি মা-বাবাদের ঘরে জন্ম নিয়ে
পাহাড়ি। ওরা অন্য জেলার মানুষের মতাে বাংলা, ইংরেজী
কিংবা অন্য ভাষায় কথা বলে না। ওদের নিজস্ব ভাষা আছে,
নিজস্ব সংস্কৃতিও আছে। ওরা ওদের মতাে থাকতে চায়। ওরা
সমতল অঞ্চলের মানুষের মতাে পােশাক-আশাক পরে না।
ওদের সাদাসিধে জীবনাচার।
আস্ত অজগরটি কেটে টুকরাে টুকরাে করা হলাে।
বেশিরভাগ অংশ মাটির আশপাশ থেকে যােগাড় করা শুকনাে
গাছের ডালার উপর রেখে ডালায় আগুন ধরিয়ে বারবিকিউ
বানানাে হলাে। আগুনে পােড়ানাে অজগর খাচ্ছে সাতজন। এ
পাহাড়ে ওরা আগুন জ্বালায় নি। পাশের পাহাড় থেকে অজগর
নিয়ে ওরা এখন কালাপাহাড়ের পাশাপাশি ঝােপে অবস্থান
নিয়েছে।
এ অঞ্চলের প্রকৃতি দেখে ওরা নিশ্চিত হয়েছে।
অস্ত্রধারীদের টার্গেট এই কালাপাহাড়। অপরাধ চক্রের
সদস্যদের। পাহাড়ের আশেপাশে থাকতে দিবে না রমিজ
মিয়ার শিষ্যরা। ওদের মূল উৎপাটন করবে। তাই পাহাড়ি
ঝােপে ঘাপটি মেরে আছে সাতজন। সুনসান নীরবতা। জনমানব শূন্য পাহাড়ে ওরা সাতজন। নতুন একজনের উপস্থিতি
মনে হচ্ছে। হ্যা,তাই তাে ! একজন মানুষ কালাপাহাড়ের ঠিক
কাছে। ও কী যেন খুঁজছে। হয়তাে ঐ অস্ত্রটির সন্ধানই করছে।
বার্মিজ ও পান্ডুজ লােকটির দিকে ছুটে যায়। লােকটির সঙ্গে
কোন মারণাস্ত্র থাকতে পারে। তবুও ওকে বন্দি করতে হবে।
তাহলেই ওর চক্রের সন্ধান মিলবে। বার্মিজ আর এক মুহূর্তও
অপেক্ষা করতে চাইছে না। শর্সা মরমা ফিসফিস করে ওকে
বুঝাতে চাইল, ধৈর্য ধরতে বলল। এমনও হতে পারে ও একা
নয়, ওর সঙ্গে ওর দলবলও আছে। লােকটা কালাপাহাড়ের।
আশপাশ লক্ষ করে চলছে।
অস্ত্রের তাে হাত-পা নেই। হাঁটতে পারে না। কী জবাব।
দিবে সে তার দলপতিকে ? সময় যত গড়ায় লােকটার চেহারা
তত মলিন হয়। এতক্ষণ আশেপাশে অন্ধকার থাকলেও এখন
কিছুটা কমে আসছে। মেঘে ঢাকা চাঁদটা আবারও পৃথিবীর বুক
দেখে হাসছে।
শর্সা মরমা শব্দ করে তাদের ভাষায় কী যেন উচ্চারণ করে।
এক সঙ্গে সাতজনই ঝােপ থেকে বেরিয়ে পড়ে। লােকটা
সাতজন অপরিচিত মুখ দেখে ঘাবড়ে যায়। ও পালানাের
কোনাে চেষ্টাই করে না। তবুও ওর দুই হাত গাছের লতাপাতা।
দিয়ে বাঁধা হলাে। বাঁধা হলাে পা দুটোও। হাত ও পায়ের মাঝে
বাঁশ ঢুকিয়ে লােকটাকে কাঁধে নিয়ে বের হয়ে পড়ে ওরা।
কেউ কারও সঙ্গে কোনাে কথা বলে না। লােকটার চোখে
মুখে ভয়ের ছাপ। ওই লােকটাও কিছুই বুঝতে পারছে না, কী
থেকে কী হচ্ছে! লােকটাকে দেখেই ওরা বুঝতে পেরেছে, সে
ভিনদেশি। লােকটাকে বার্মিজ প্রশ্ন করছে। লােকটা কিছু না
বুঝে ফ্যালফ্যাল করে ওর দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া কিছুই
বলতে পারছে না। পাহাড়ি অঞ্চলে এই লােকটা নতুন নয়। অস্ত্র।
চোরাচালান চক্রের সঙ্গে কাজ করছে কয়েক বছর হলাে। এ
অঞ্চলের কোনাে পাহাড়ির সঙ্গে এর আগে কথা বলার প্রয়ােজন
হয় নি।
লােকটাকে নিয়ে জনের দলের সবাই প্রায় তিন ঘন্টা
হেঁটেছে। জোছনা একটু পর চলে যাবে। আকাশে মেঘগুলাে
এখন আর নেই। শীতের রাতে সাধারণত কুয়াশা থাকে। ওরা
যে পাহাড়ের পাদদেশে, সে পাহাড়ের ঠিক নিচটা অনেক দূর।
এ পাহাড় থেকে যদি কেউ পড়ে যায় তাকে আর খুঁজে পাওয়ার
কোনাে উপায় নেই।
শর্সা মরমা সবার উদ্দেশে বলল ‘লােকটার হাত পায়ের
বাধন খুলে দেওয়া হােক। বার্মিজ তার সঙ্গে থাকা ছুরি দিয়ে
লােকটির হাত-পায়ের বাঁধন কেটে দিল। লােকটাকে ইশারা
করে বলা হলাে উঠে দাঁড়াতে। লােকটা উঠে দাঁড়াতে পারছে।
না । তার দুই হাতের যেখানে বাঁধা হয়েছিল, সে জায়গাটি লাল
হয়ে গেছে। পায়ের বাঁধনের জায়গায়ও ক্ষত তৈরি হয়েছে ।
রাত গড়িয়ে সকাল চলে এলাে। পাহাড়ি এলাকায় কোনাে
মসজিদ, মন্দির নেই। এ অঞ্চলে কোনাে মানুষের বসত নেই।
এখানে দেশের অন্য এলাকার মতাে ভােরে আযানের ধ্বনি
ভেসে আসে না। এখানে মন্দিরের বাদ্য বাজে না। এখানকার
প্রকৃতিই বলে দেয়, কখন সকাল কখন বিকাল । সকালের সূর্যটা
আকাশে উঁকি মারছে। সূর্যটা টুকটুকে লাল। একটা অন্যরকম
ঘােরে আছে সাতজন। আছে সমতল অঞ্চলের মানুষটিও ।
বার্মিজদের হাতে সাত দিন সময়। এর মধ্যে শিকার নিয়ে
রমিজ মিয়ার দরবারে হাজির হতে হবে। না হয় সাধনা বৃথা
হবে। শিক্ষা ব্যর্থ হবে।
যদিও রমিজ মিয়া অন্য জেলার মানুষ। এক সময় এই রমিজও
পাহাড়িদের ভাষা বুঝতাে না। এখন বােঝেন। রমিজ মিয়া
চাইলে হয়তাে ওর শিষ্যদের সমতল অঞ্চলের ভাষা শেখাতে
পারতাে। কিন্তু তা করেন নি। নিজে পাহাড়ি ভাষা রপ্ত
করেছেন । রমিজ মিয়ার মুখ দেখেও নাসিদং স্কুলের সদস্যরা
বুঝতে পারে,
কী চাইছেন রমিজ। গুরুকে অনেক ভালােবাসে
শিষ্যরা। গুরুভক্তিকে খুব গুরুত্ব দেয়। রমিজ মিয়ার সঙ্গে
পরিচয়ের আগে ওরা বুঝত না বাস্তবতা। বুঝত না এক সঙ্গে
থেকে উন্নয়ন বেগবান হয়। নিজেদের দুঃখ-কষ্ট লাঘব হয়
পাশাপাশি থাকার কারণে।
রমিজ মিয়া পাহাড়ে আসার আগে পাহাড়িদের কোনাে
অভিভাবক ছিল না। ওরা ছন্নছাড়া জীবনে ছিল। বিগত কয়েক
বছর ধরে ওরা এখন আর দূর-দূরান্তে থাকেনা। ওরাও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র
পাড়ায় একই সঙ্গে থাকে। পাড়া প্রধান প্রতিটি পাড়ার নিয়মনীতি রচনা করেন। এবং সে অনুযায়ী জীবন ধারণ করেন।
নাসিদং স্কুলের ছেলেমেয়ে এবং এই স্কুলের অভিভাবকরা
পাহাড়ে থেকেও খুব ডিসিপ্লিন জীবনযাপন করে। এখানে
খাবারদাবারের খুব অভাব হলেও এ অঞ্চলের লােকজন সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। সুঠাম দেহ কিন্তু শরীরের মাংস পেশিগুলাে
সমতল অঞ্চলের মানুষদের মতাে না। ওদের শরীরের
মাংসপেশি শক্ত। হাড়গােড়ও শক্ত। হাড়ের সঙ্গে মাংসগুলাে
পাকাপােক্তভাবে লাগানাে। শরীরের চামড়ার রং একদম সাদা
, আবার একদম কালােও না।
‘তােমরা
সমতল অঞ্চলের যে মানুষটিকে ওরা পাকড়াও করে ধরে।
এনেছে-তার শরীরের গঠন পাহাড়িদের মতাে ছােটখাট গড়নের।
হলেও লােকটির গায়ে বেশ মাংস আছে মনে হয়। গালেই
কেজি দুই-এক হবে। কপালটা বড়, চোখ দুটি হরিণের চোখের
মতাে। শসা মরমা বার্মিজকে তাদের ভাষায় বলল,
বিশ্রামে যাও সবাই। ভিনদেশিকেও বিশ্রাম নিতে দাও।
শর্সা মরমা ভাবুক মানুষ। একা বসে থাকতে বেশি
ভালবাসে। সেই ছােটবেলা থেকেই যখন সে আর তার মা মিলে।
একটি পাড়ায় থাকতাে তখন প্রকৃতিই ছিল তার বন্ধু । মা নিজের
এবং সন্তানের খাবার জোটাতে সারাদিন এ পাহাড় থেকে ও
পাহাড়ে চষে বেড়াতাে। ছেলে শসা একদম অবুঝ ছিল ।
কোনাে ভাবেই বুঝতে চাইতাে না, খাবার জোটানাের জন্য
একজন মানুষকে পরিশ্রম করতে হয়। খাবার চাইলেই চলে
আসে না।
বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে শর্সার খাবার-দাবারের দায়িত্ব
পড়ে মায়ের উপর। বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব তিনি তার সৃষ্টিকর্তার
কাছে ছেড়ে দিয়েছিলেন। শর্সা পাহাড় থেকে পড়ে যায় নি
কখনাে। মা চাইলে অন্যসব পাহাড়িদের মতাে সন্তানের পায়ে
শক্ত করে লতাপাতা দিয়ে আটকে রাখতে পারতেন। কিন্তু তা
করেন নি। ছেলেকে রেখে দিনের বেশিরভাগ সময়ই ভিন্ন পাহাড়ে
যেয়ে খাবারের সন্ধান করতেন। শর্সাও দিনভর বসে থাকত না।
প্রথম প্রথম কঁদত। তারপর আর কান্নাকাটি করে নি।
সে বুঝতে পেরেছিল, তার সময় তার মতােই কাটাতে
হবে। মায়ের জন্য কান্না করার দরকার নেই। মা আসবে এবং
সূর্য ডােবার আগেই আসবে। সকালের সূর্য শর্সার চেতনাকে
জাগায়। সে পণ করে অজান্তে নিজের সাথে । শর্সা তার শৈশব
পার করে অবচেতনে। আবার ফিরে আসে বাস্তবে।
সূর্যের উত্তাপ বেড়েছে। ঠান্ডা কমছে। সকালের আকাশটা
বিশাল মনে হয় পাহাড়িদের কাছে। আকাশের বিশালতা দেখে
দেখে পাহাড়িদের মনও বিশাল হয়। বিশাল মনের পাহাড়ি শর্সা
অস্ত্র চোরাকারবারি দলের একজনকে ধরে এনেছে। যতটুকু কষ্ট
ওই লােকটাকে দেওয়ার কথা তা দিচ্ছে না। হাত-পা বাঁধা
অবস্থায় বাঁশের সঙ্গে ঝুলানাে মানুষটাকে কাঁধে তুলে নিয়ে
এল । ওই মানুষটা ব্যথা পাবে এ চেতনা শর্সা মরমার দলের
মানুষদের নেই। যদি থাকত তবে হয়তাে ওরা এভাবে ঝুলন্ত
অবস্থায় মানুষটাকে নিয়ে আসত না, ওরা স্বাভাবিক ভাবেই
নিয়ে আসত। সমতল অঞ্চলের মানুষটি উঠে বসেছে।
মাংসবহুল মুখমণ্ডল লাল হয়ে গেছে। সে চিন্তিত। মনে মনে
ভাবছে, তার কপালে হয়তাে এমনটাই লেখা ছিল। সে তাে
জানত না এ পাহাড়ে মানুষ আসবে। সে তাে জানত না তার
এমন সময় পার করতে হবে।
বার্মিজ দলের অন্য সদস্যদের কাছে কিছু বলার অনুমতি
চাইল। এ পাহাড়ে থাকা আট জনই ক্লান্ত। গতকাল ঘুমায় নি
কেউ। সকালের সূর্যের আলাের তাপটা ভালােই লাগছে ওদের।
পাহাড়ি সাতজনের মুখ ভর্তি দাড়ি। ওদের চুলও অনেক বড়।
মেয়েমানুষের চুল নাকি পুরুষমানুষের চুল, তা খোপা ছাড়া
বােঝা যায় না। কারণ পাহাড়ি এলাকায় পুরুষ ও মহিলাদের
খোঁপা বাঁধার পদ্ধতি ভিন্ন।
সমতল অঞ্চলের মানুষটির মাথার চুল ছােট। ওর মুখে
খোঁচা খোঁচা দাড়ি। এমন মানুষ পাহাড়ে পাহাড়িরা কখনাে
দেখে নি। ওরা মানুষটাকে বিরক্ত করছে না। লােকটি উঠে
দাঁড়িয়েছে, হাঁটার চেষ্টা করছে। ছােট ছােট পা ফেলছে। বার্মিজ
লােকটাকে ভিন্নভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। লােকটাকে দেখে তার
ভেতর মায়া কাজ করছে। মানুষটাকে মনে হচ্ছে ক্ষুধার্ত।
নিজের মধ্যেও খিদে জেগে উঠেছে।
সে শর্সা মরমাকে জানাল তার খিদে লেগেছে। শর্সা মরমা
পান্ডুজ আর মানুজকে ইশারায় কাছে ডাকল। ওদের শিকার
করা অজগরের বাকি অংশটি নিয়ে আসতে বলল।
কালাপাহাড়ে ঠিক পাশের ঝােপের মাটি কেটে গর্ত করে পুঁতে
রাখা হয়েছিল অজগরের মাংসের কিছু অংশ। গত রাতে
অজগরের মাংস তারা পুড়িয়ে খেয়েছে। পান্ডুজ আর মানুজ
রওনা হলাে অজগরের মাংস আনার জন্য।
সমতল অঞ্চলের লােকটিকে ইশারায় কাছে ডাকল শর্মা।
ইশারায় জানতে চাইল, কে তুমি!
লােকটি জবাব দিচ্ছে ইশারায়। দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে
পাহাড়ি ভাষায় কথা বলছে।
তাক লেগে গেল অন্যদের।
লােকটি ওদের ভাষাও জানে!
ওরা মনে মনে অবশ্য খুশি।
মানুষ খুশি মনে থাকলে মুখে হাসির ঝিলিক পড়ে। হাসলে
মন পবিত্র হয়। দেহ শক্তি পায়। হাসি হাসি মুখ নিয়ে সবাই
কথা বলছে। কিন্তু সমতল অঞ্চলের মানুষটি হাসতে পারছে না।
কথা বলার আগ পর্যন্ত সে আতঙ্কিত ছিল।
রমিজ মিয়া কথা বলার মানুষ, শিশুদের কথা বলা
শিখিয়েছেন। সুন্দর সুন্দর কথা বলে আসর মাতাতে পারেন
রমিজ। শিষ্যদের চেতনাকে জাগ্রত করতে রমিজের তুলনা
নেই। কথার ফুল ছড়ানোে রমিজ আজ দলের সঙ্গে নেই।
সাতজনের দু’জন খাবার আনতে ব্যস্ত। পাঁচজন সমতল
অঞ্চলের লােকটির কথা শুনছে। লােকটি এবার গান গাইতে
ওরু করল:
করাে লাফালাফি
টাকসালে
কোন পথে যদি
মানবিক হইবা না।
তােরা যেতে চাও মক্কা
যদি খাও ধাক্কা দিয়ে দাঁড়াও।
অদ্ভুত অদ্ভুত বলে চিৎকার করে উঠল শিকারিরা। অস্ত্র
চোরাকারবারিতে এমন মানুষ কেন? জানতে চাইল বার্মিজ ।
লােকটি জানাল, তার এ ছাড়া কিছুই করার ছিল না। নিজের
মধ্যে দেশপ্রেম জেগেছিল। দেশের স্বাধীনতা থেকে শুরু করে
উন্নয়নের সঙ্গে জড়িত মানুষদের সংস্পর্শ পেয়েছে লােকটি।
কাউকে ছবিতে, কাউকে কল্পনায়, কাউকে বাস্তবে। সেই শৈশব
থেকে মধ্য বয়স পর্যন্ত সময় কাটিয়ে সে উপলব্ধি করেছে তাকে
এমন কিছু করতে হবে যা দেশের জন্য, মানুষের জন্য কাজে
আসবে। তার জীবনেও অনেক দেখার সুযােগ হয়েছে। সে
দেখেছে গ্রামগুলাে শহর হচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে দেশের সংস্কৃতি,
হারিয়ে যাচ্ছে জয় বাণী।
চারপাশ উত্তপ্ত। বােমা বানাচ্ছে মানুষ। সেই বােমার।
আঘাতে মরছে মানুষ। এই দেশের মানুষরা তাকে বাধ্য করছে।
অস্ত্রের চোরাচালানে জড়াতে। সে এ জীবন চায় নি। চেয়েছিল।
একটা সুন্দর জীবন। চেয়েছিল নীরব থাকতে, নিরবেই চলে।
যেতে। শিক্ষিত মানুষ ভিনদেশি।
রমিজ মিয়ার শিষ্যরা গুরুর কাছ থেকে দীক্ষা নিয়েছে।
গুরুর দীক্ষা তারা পেয়েছিল মা-বাবার ইচ্ছায়।
নিজের অজান্তে রমিজ মিয়াকে আপন করে নিয়েছিলেন পাহাড়ি
শশাংক। শশাংক এক রাতে ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে দেখেছিলেন,
পাহাড়ে একজন মানুষ আসছে। তার মুখমণ্ডল উজ্জ্বল, চোখ
দুটো নক্ষত্রের মতাে। দৃষ্টিতে তির্যক ভাব। লােকটা পাহাড়ি
ভাষায় কথা বলছে। প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। শশাংক দেশের পাহাড়ি
প্রতিনিধি। দেশের সমাজকে মেধাবী সন্তান দিয়েছেন শশাঙ্ক।
শশাঙ্কের স্বপ্নে দেখা মানুষটি স্বপ্ন দেখার পরদিনই পাহাড়ে
হাজির হয়েছিলেন। তিনি রমিজ। তিনি এসেছেন পাহাড়ি
জনপদকে মুক্ত করতে। পাহাড়ি মানুষরাও যে আল্লাহর সৃষ্ট
মানুষ, তা দুনিয়াকে দেখানাের জন্য। পাহাড়ি মানুষদের দেশের
অন্য জেলার মানুষরা অবহেলা করে, অবজ্ঞা করে। ওরা বুঝতে
চায় না পাহাড়িদের । অন্য জেলার মানুষদের ওপর অনেক রাগ
ছিল শশাংকের। পাহাড়ে রমিজকে পেয়ে তার সব রাগ চলে
গেছে। রমিজের এক শিষ্য গান গাইছেএকবার এসাে হে প্রভু নিরঞ্জন।
এ ভব তরঙ্গ দেখে
ভাব জানত না পাহাড়ি মানুষরা। ওরা রমিজের কাছে দরবারে
এসে কথা শিখেছে। দরবারে এক সময় নিয়ম ছিল যে কোনাে
পাহাড়ি চাইলেই এ দরবারের সদস্যপদ পাবে। এখন নিয়মের বদল
হয়েছে। এখন স্কুলে এসে অধ্যয়ন করতে হবে। তারপর পরীক্ষাশিকারের পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় পাশ হওয়ার পর হতে পারবে এই
দরবারের সদস্য। তারপর পাবে পারিবারিক জীবনের স্বাদ।

Post a Comment
0 Comments